৪
............
সপ্তাহ খানেক পরে ভোর ছয়টার দিকে পুষ্পিতার সাথে আবার দেখা হলো কালাম চাচার দোকানে।সেইদিনও একই অবস্থা। চামচে চা নিয়ে ফুঁ দিয়ে, দিয়ে চা খাচ্ছে।ওর চামচ দিয়ে চা খাওয়ার দৃশ্যটা আমার এতটা ভালো লেগে যাবে বুঝতেই পারিনি।পুষ্পিতা
এর মধ্যে কালাম চাচাকে টাকা দিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম-
কিছু বলবেন?
হ্যা ওই যে সেইদিন কিছু জিজ্ঞেস করবেন বলেছিলেন?
হ্যা আসলে......
আপনার কাজ শেষ হলে চলুন হাটতে, হাটতে কথা বলা যাক।
চলুন….
পুস্পিতা হাটতে লাগলো এইখানকার বড় মাঠটার দিকে।আমিও পাশাপাশি হাটতে লাগলাম।পুষ্পিতা বললো-
কি জিজ্ঞেস করবেন.??
না মানে আসলে আমার খুব কৌতূহল হচ্ছে। আপনি ওইভাবে চামচ দিয়ে চা.... এটাই জানতে চাইছিলাম আর কি…
আমার কথা শুনে পুষ্পিতা শব্দ করে হেসে উঠলো।ওর হাসির শব্দটা শুনে বুকের মধ্যে কেমন জানি একটা লাগলো।ও হাসি থামিয়ে বললো-
আসলে ছোট বেলায় একবার চায়ের কাপে মুখ লাগিয়ে চা খাওয়ার সময় ঠোট আর জিহ্বা পুড়ে গেছিলো।তারপর থেকে কাপে মুখ লাগিয়ে খেতে ভয় করে।এই জন্যে চামচ দিয়ে খাই।কালাম চাচার বানানো চা খুব টেস্টি।সব সময় আসিনা কালাম চাচার দোকানে।কোন মেয়ে চায়ের দোকানে বসে চা খাবে এইটা বেশ বেমানান দেখাই।তাই যখন সকালের দিকে যখন কেউ থাকেনা তখন আসি। মন খারাপ থাকলে এই চা আমার মন ভালো করার ঔষধ।
তার মানে আজকে আপনার মন খারাপ?
ও আমার কথার জবাব দিলো না।
সমস্যা না থাকলে শেয়ার করতে পারেন।
পুষ্পিতা আমাকে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলো।হঠাতই একটা বাইক আমাদের সামনে এসে থামলো।
ছেলেটা যখন হেলমেটটা খুললো তখন ছেলেটাকেও চিনলাম।এই ছেলেটাকেই সেদিন পুষ্পিতা থাপ্পড় মেরে ছিলো।
ছেলেটা বাইকটা স্ট্যান্ড করে পুষ্পিতার সামনে দাঁড়িয়ে বললো-
সেদিন তো আমাকে খুব বড়, বড় লেকচার দিয়েছিলি।ব্রেকাপ হলো কি না হলো সকাল, সকাল আরেকটা প্রেমিক নিয়ে বেড়িয়ে পরেছিস।এখন কোথায় গেলো তোর সতীত্ব?একচুয়্যালি ইউ আর দ্য ব্লাডি বি
ছেলেটার কথা শেষ না হতেই ডান গালে জোরসে একটা থাপ্পড় পরলো। আমি ছেলেটার গালের দিকে একটু ভালো করে তাকালাম।ফর্সা গাল হাতের পাঁচ আঙুলের বসে গেছে।বাপরে মেয়ের হাতে জোর কত!!
ছেলেটা চড় খেয়ে ফুঁসতে, ফুঁসতে বাইক নিয়ে চলে গেল
আর পুষ্পিতা হাটতে, হাটতে মাঠের পাশে যে পুকুরটা আছে সেইখানে গিয়ে দুহাত বুকের সাথে জড়ো করে দাঁড়ালো। আমি কি মনে করে, করে ওর পিছুপিছু গেলাম।এটা বুঝতে পারলাম ছেলেটা পুষ্পিতার বয়ফ্রেন্ড ছিলো। এখন আর নেই...... আমি পুষ্পিতার পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই বললো-
৫
............
সারারাত ঘুমাইতে পারিনি।শুধু বিছানায় গড়াগড়ি আর গান শুনে কাটিয়ে দিয়েছি।খুব সকাল বেলা হাটতে, হাটতে কালাম চাচার দোকানের পাশে মাচাটায় বসলাম।কালাম চাচা এখনো দোকান খুলেনি।কিছুক্ষণ বাদে পুস্পিতাকেও দেখলাম এইদিকেই আসছে।চোখ দুইটা লাল হয়ে আছে। মনে হয় সারারাত কান্না করেছে।পুষ্পিতা আমার সামনে এসে দাঁড়ালো...
"আসলে.....
এইটুকু বলেই চুল গুলা কানের একপাশে গুঁজে দিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলো।আমি বললাম
"স্যরি......
"জ্বীইই?
"আই এম স্যরি। আসলে আপনাকে কালকে ওইভাবে রেখে আসাটা উচিৎ হয়নি।
পুষ্পিতা খানিকটা হাসার চেষ্টা করলো।তারপর বললো-
"আমি তো ভেবেছিলাম আপনাকে স্যরি বলবো।আমার জন্য আপনাকে ওকয়ার্ড একটা সিচ্যুয়েশানে পরতে হলো।
"সমস্যা নেই।মনের কথা চেপে রাখতে নেই।শেয়ার করলে মন হাল্কা হয়।ও কেবল হাসলো।এইবারের হাসিটা একদম অন্যরকম। হাসিটা দেখেই আবার বুকের মধ্যে কেমন জানি করে উঠলো...
" রাত্রির সাথে ছয়মাস রিলেশন ছিলো।কখনো ওর হাসি দেখে এরকম মনে হয়নি।ওর সাথে থাকলে কেমন জানি দম বন্ধ হয়ে আসতো।আমাকে ওর গোলাম বানিয়ে রেখেছিলো।উঠতে বললে উঠতে হবে বসতে বললে বসতে হবে।নিজের কোন স্বাধীনতাই ছিলো না।পরে যখন ওর সাথে একেবারেই থাকতে পারলাম না তখন ব্রেকাপ করে নেই।ব্রেকাপের পর আমি খুব হ্যাপি ছিলাম।আই থিংক ও নিজেও এই রিলেশনশিপে হ্যাপি ছিলোনা।তাই দুইদিক থেকে কেউই আর যোগাযোগের চেষ্টা করিনি।"
পুষ্পিতা বললো
"কি মি. কই হারাইলেন? কালাম চাচা দোকান খুলেছে। আপনি কি যাবেন?
"হ্যা চলেন.....
পুষ্পিতা চামচ দিয়ে চা খাচ্ছিলো আর আমি আড় চোখে দেখছি।
"এভাবে আড় চোখে দেখার কিছু নাই।আমি ওর কথায় আবারো কেবল লজ্জা পেলাম।মেয়েটা বুঝে কিভাবে যে কেউ ওকে আড় চোখে দেখছে? অদ্ভুত তো!!
এরপর একদিন নাম্বার নিয়েছিলাম।ওর হাসিটা অনেক সুন্দর।ও ফোনের অপাশ থেকে শব্দ করে হাসলে আমি এপাশ থেকে অনুভব করতাম।আস্তে আস্তে একটা ভালো আন্ডারস্ট্যান্ডিং হয় আমাদের।আপনি থেকে তুমি।তবে আমাদের মধ্যে রিলেশনটা ফ্রেন্ডশিপ নাকি অন্যকিছু বুঝতে পারিনা।ও কখনো বুঝতে দেয়নি।আমি ওর জন্য কিছু একটা ফিল করি।কিন্তু কখনো জানানো হয়নি।ইচ্ছা করে জানাইনি।একটা ছেলে যদি কোন মেয়ের বিশ্বাস ভাঙে অন্য আরেকটা ছেলের বিশ্বাস অর্জন করতে অনেকটা সময় লাগে…
"একসময় বুঝতে পারলাম ওর উপরে খুব নির্ভরশীল হয়ে পরছি।ওকে ছাড়া আমার কোন কিছু ঠিক মত হচ্ছেনা।দিনে একবার কথা না হলে মনের মধ্যে কেমন একটা ছটফটানি অনুভব করতাম।তাই ইচ্ছা করে মেস চেঞ্জ করে যোগাযোগ কমিয়ে দিলাম।নিজেকে অন্য কাজের মধ্যে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করতে লাগলাম।ও মাঝেমাঝে ফোন দিয়ে খোঁজখবর নিতো।কিন্তু আমি ফোন দিতাম না।তারপর বাবা মারা গেলো।মেইস ছেড়ে চলে আসলাম।মাস খানেক পার হওয়ার পর পুষ্পিতার মধ্যে একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম।নিয়মিত আমার সাথে কথা বলে।মাঝে মাঝে দেখাও করতে বলে।লক্ষ্য করলাম আমি আবারো ওর উপরে ডিপেন্ডেবল হয়ে পরছি......
একটা ছেলের ভাবনা চিন্তা ভাবনা এতটা খারাপ কিভাবে হয়।তিনবছরের রিলেশনশিপ ছিলো আমাদের।সেদিন রেস্টুরেন্টে ইনিয়েবিনিয়ে আমাকে ওর সাথে রুমডেটে যেতে বলে নয়তো সম্পর্ক রাখবেনা বলে জানিয়ে দেয়।নিজের শারীরিক চাহিদা মেটানোর জন্য তাহলে আমার পিছনে কেন তিনটা বছর নষ্ট করলো।প্রস্টিটিউট এর কাছে গেলেই পারতো।আমার ফ্রেন্ডরা বার, বার বলেছিলো ওকে বিশ্বাস না করতে কিন্তু আমি সব সময় ওকে ডিফেন্ড করেছি।আর ও আমার বিশ্বাসের এই মূল্য দিলো না।
ওর মুখে এরকম কথা শুনার পরেই কেন জানিনা আমার রাগ উঠতে লাগলো ছেলেটার উপরে।ওকে পুকুরপাড়ে রেখেই আমি চলে আসলাম… আচ্ছা আমার কেন রাগ হচ্ছে? ছেলেটা ওকে ঠকিয়েছে সেইজন্য নাকি মেয়েটার কান্না আমার সহ্য হচ্ছেনা এইজন্য?
জানিনা আমি.... মেসে গিয়ে শুয়ে পরলাম।কিন্তু শুধু পুষ্পিতার কথাই মনে হচ্ছে।ও কান্না করছে ভেবেই মনটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে আমার।জানিনা কেন এমন হচ্ছে। এমনটা আমার সাথে কখনো হয়নি।সারাদিনে এমনকি রাতেও পুস্পিতা নিয়ে ভেবেছি।ওইভাবে আমার পুকুরপাড় থেকে চলে আসা উচিৎ হয়নি।নিজের মধ্যেই কেমন একটা গিলটি ফিল হচ্ছে
You must be logged in to post a comment.