ক্যানসার এখনো এক মরণব্যাধির নাম। ক্যানসার চিকিৎসার সবচেয়ে বড় বাধা প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যানসার শনাক্ত করতে না পারা। শরীরে ক্যানসার যখন স্থায়ীভাবে বাসা বেঁধে ফেলে তখন শুরু হয় চিকিৎসার তোড়জোড়। কিন্তু তখন আর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। অথচ যদি আগেভাগেই জানা যেত ক্যানসার আছে কি না তাহলে হয়তো সুস্থ হওয়া সম্ভব ছিল। অজান্তে এ রোগের বাসা বাঁধার প্রধান কারণ জটিল ও ব্যয়বহুল শনাক্তকরণ পদ্ধতি। যেমন আপনি স্তন ক্যানসারের জন্য টেস্ট করলেন, দেখা গেল আপনার স্তন ক্যানসার নেই। কিন্তু হয়তো ব্লাড ক্যানসারে ভুগছেন, আর সেটা স্তন ক্যানসারের টেস্টে ধরা পড়ল না। গবেষকেরা তাই এমন একটা সর্বজনীন পরীক্ষা আবিষ্কারের চেষ্টা করছিলেন, যাতে যেকোনো ধরনের ক্যানসার একটি পরীক্ষার মাধ্যমেই ল্যাবে ধরা পড়ে। অস্ট্রেলিয়ান ইনস্টিটিউট ফর বায়ো-ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ন্যানোটেকনোলজির একদল গবেষক সেই চেষ্টায় সফল হয়েছেন। তাঁরা আবিষ্কার করতে পেরেছেন এমন এক বায়োমার্কার, যা সব ধরনের ক্যানসার রোগীর ক্ষেত্রে পাওয়া যায়। আর এই বায়োমার্কারের উপস্থিতি নিশ্চিত করেই খুব সহজ আর সাধারণ রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ক্যানসারের উপস্থিতি জানা যাবে। তাঁদের গবেষণাপত্রটি নেচার কমিউনিকেশনস জার্নালে গত বছর ৪ ডিসেম্বর প্রকাশিত হয়। পুরো বিশ্বের নামীদামি সংবাদমাধ্যম গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করেছে খবরটি। তবে বাংলাদেশিদের আগ্রহ ছিল একটু বেশি। তার কারণ অধ্যাপক ম্যাক ট্রাউয়ের নেতৃত্বে গবেষণায় প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন প্রবাসী বাংলাদেশি গবেষক আবু আলী ইবনে সিনা।
কী সেই বায়োমার্কার
ভূমিরূপের সৌন্দর্য ক্যামেরায় বন্দী করেন ল্যান্ডস্কেপ ফটোগ্রাফাররা। আর মিথাইলস্কেপ বায়োমার্কারকে ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপে বন্দী করেছেন গবেষকেরা! মিথাইলস্কেপ জিনিসটা আসলে কী? ল্যান্ডস্কেপ যেমন ভূমির দৃশ্য, মিথাইলস্কেপ হলো ডিএনএর দৃশ্য। আমাদের কোষ বিভাজিত হয় ডিএনএর নির্দেশ অনুসারে। ডিএনএর বিশেষ কিছু অংশের নাইট্রোজেন বেসগুলোর অণুক্রম এই নির্দেশ দেয়। চারটি নাইট্রোজেন বেসের একটি হলো সাইটোসিন। মাঝেমধ্যে বিশেষ বিশেষ জায়গায় এই সাইটোসিনের সঙ্গে মিথাইল মূলক যুক্ত হয়। সুস্থ কোষের ডিএনএতে মিথাইল মূলক এলোমেলোভাবে যুক্ত হয় না, বরং নির্দিষ্ট একটা সজ্জা বজায় রেখে যুক্ত হয়। কিন্তু ক্যানসার কোষের ডিএনএতে এই মিথাইল মূলক কোনো সাজসজ্জা মেনে চলে না। হঠাৎ হয়তো কোনো জায়গায় মিথাইল মূলক উধাও হয়ে যায়, আবার কোনো জায়গায় এরা অনেক বেশি মিথাইলেশন হয়ে গুচ্ছ আকারে থাকে। যে জায়গায় মিথাইল সাইটোসিনের গুচ্ছ থাকে সে জায়গায় মিথাইল ল্যান্ডস্কেপের সৃষ্টি হয়। আর এই মিথাইলস্কেপ পাওয়া যায় প্রায় সব ক্যানসার কোষের ডিএনএতে। এটাই সে সর্বজনীন মার্কার, যাকে দিয়ে শনাক্ত করা সম্ভব শরীরে কোনো ক্যানসার কোষের ডিএনএ আছে কি না।
তত্ত্বীয়ভাবে মিথাইলস্কেপ দেখতে পাওয়া মানেই ক্যানসারের উপস্থিতি। কিন্তু মিথাইলস্কেপ দেখা যাবে কীভাবে? সে উপায়ও গবেষকেরা বাতলে দিয়েছেন, সময় নিয়েছেন মাত্র ১০ মিনিট! সুস্থ কোষের ডিএনএ আর ক্যানসার কোষের ডিএনএ তরল দ্রবণে ভিন্নভাবে ত্রিমাত্রিক গঠন ধারণ করে। সুস্থ কোষের ডিএনএ সুসজ্জিত মিথাইল সাইটোসিনের কারণে দ্রবণে বেশি জমাট বাঁধে। কিন্তু ক্যানসার ডিএনএতে মিথাইলস্কেপের কারণে অতটা জমাট বাঁধে না। কে কতটা জমাট বাঁধল, তা নিশ্চয়ই খালি চোখে দেখা যাবে না, কারণ ডিএনএ অতি ক্ষুদ্র অণু। এ জন্য গবেষকেরা স্বর্ণের সাহায্য নিলেন। বিশুদ্ধ ডিএনএকে সোনার ন্যানোপার্টিকেল যুক্ত দ্রবণে রেখে লবণ যোগ করলে সোনার ন্যানোপার্টিকেল জমাট বেঁধে যায়। জমাট বাঁধার এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় ১০ মিনিটেই, আর দেখা যায় খালি চোখেই! সোনার ন্যানোপার্টিকেল যোগ করলে দ্রবণের রং লালচে থেকে ধীরে ধীরে নীলচে রং হয়ে যায়। এই রং বদলের কারণ মিথাইল সাইটোসিন।
সুস্থ কোষের ডিএনএতে তুলনামূলক বেশি মিথাইলসাইটোসিন সুসজ্জিত থাকে, তাই রঙের পরিবর্তন হয়। ক্যানসার কোষের ডিএনএতে মিথাইল সাইটোসিনের পরিমাণ কম থাকে। তাই সোনার ন্যানোপার্টিকেল যোগ করার পর ক্যানসার কোষের ডিএনএর দ্রবণের রঙে কোনো পরিবর্তন হয় না। যদিও রং পরিবর্তনের এই কারণ এখনো প্রমাণিত নয়। এই সাধারণ পরীক্ষা করতে বায়োপসি বা সার্জারির মতো জটিল কোনো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয় না। আবার পিসিআরের মতো ব্যয়বহুল কোনো প্রযুক্তিরও প্রয়োজন নেই। শরীরের বিভিন্ন তরলে থাকা ভাসমান মুক্ত ডিএনএ (সার্কুলেটিং ফ্রি ডিএনএ) সংগ্রহ করেই পরীক্ষা করা যাবে। এ জন্য রোগীকে শুধু এক সিরিঞ্জ রক্ত দিলেই চলবে। এমনকি মুখের লালা বা ইউরিন সংগ্রহ করেও টেস্ট করা যাবে!
গবেষকদের দাবি, শতকরা ৯০ ভাগ ক্ষেত্রে এই পরীক্ষা সঠিকভাবে ক্যানসার শনাক্ত করতে পারে। তার মানে এই টেস্টের সীমাবদ্ধতা হলো, ১০ ভাগ ক্ষেত্রে এটি ভুল ফলাফল দিতে পারে। কিন্তু ১০০ জনের মধ্যে ৯০ জনেরও যদি প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যানসার ধরা পড়ে তাহলে ক্যানসারে মৃত্যুর হার অনেকখানি কমিয়ে আনা সম্ভব। এ যেন ১০ মিনিটের এক স্বর্ণালি পরীক্ষা, যা বাঁচিয়ে দিতে পারে হাজার হাজার প্রাণ। গবেষণার এই পর্যায়ে আরও উন্নতির দিকে ঝুঁকছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁরা চান এ রকম সহজ আর সাশ্রয়ী পরীক্ষার মাধ্যমেই ক্যানসার কোন পর্যায়ে আছে, ক্যানসার থাকলে সেটি কোন ধরনের ক্যানসার, এসব তথ্য জানা যাবে।
সূত্র: নেচার কমিউনিকেশনস
You must be logged in to post a comment.