Top: সূর্য কীভাবে বাঁচিয়ে রাখছে

প্রত্যেক প্রাণের টিকে থাকার জন্য, বেঁচে থাকার জন্য দরকার শক্তি। মোবাইলের স্ক্রিনে যা দেখছি তার জন্য দরকার শক্তি, ফ্যানের নিচে বসে আরাম করছি তার জন্য দরকার শক্তি, রংবেরঙের কাপড় পরে ফ্যাশন করছি তার জন্যও দরকার শক্তি। এমনকি বেঁচে যে আছি তার জন্যও দরকার শক্তি। বেঁচে থাকার জন্য এবং টিকে থাকার জন্য যত শক্তির দরকার হয় তার সবই আসে সূর্যের কাছ থেকে।

হয়তো খাবার খেয়ে শক্তি পাচ্ছি কিন্তু সেই শক্তির জোগানদাতা খাবার নয়, সূর্য। হয়তো জলবিদ্যুৎ বা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিদ্যুৎ থেকে মোবাইল চার্জ করছি, কিন্তু সেই শক্তির জোগানদাতা বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, সূর্য। শুধু এগুলোই নয়, পৃথিবীর প্রায় সব শক্তির পেছনেই আছে সূর্য।

সূর্যের বুকে নিউক্লিয়ার ফিশনের মাধ্যমে অকল্পনীয় পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন হয়। সেগুলোর ক্ষুদ্র অংশ বিকিরণের মাধ্যমে পৃথিবীতে এসে পৌঁছায়। এই সামান্য শক্তিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে পৃথিবীর পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্য। মোটামুটি পৃথিবীর সব জীব অস্তিত্ববান আছে সূর্যের শক্তিকে ব্যবহার করে। কীভাবে?

প্রথমে উদ্ভিদের কথা বিবেচনা করি। উদ্ভিদ নিজেদের খাদ্য তৈরি করে সূর্যের আলো থেকে। সূর্যের আলোর সঙ্গে বায়ুমণ্ডলের কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং শিকড়ের মাধ্যমে মাটি থেকে শোষণ করা খনিজ পদার্থের বিক্রিয়ায় তৈরি হয় উদ্ভিদের খাদ্য।

খাদ্য তৈরি করার এ কাজটি করে উদ্ভিদের পাতা। পাতার মধ্যে ঘটে যাওয়া প্রক্রিয়াগুলো হাজার হাজার সোলার প্যানেলের সমন্বয়ে তৈরি বিশাল এক ফ্যাক্টরির মতো। সূর্যের শক্তি যেন বেশি বেশি করে ব্যবহার করা যায়, সে জন্য গাছের পাতাগুলো চ্যাপ্টা হয়ে থাকে। চ্যাপ্টা হলে এর ক্ষেত্রফল বাড়ে এবং বেশি জায়গাজুড়ে আলো পড়ে। বেশি আলো পড়ার মানে হলো বেশি পরিমাণ শক্তি তথা খাদ্য উৎপাদন।

পাতায় উৎপন্ন হওয়া বিভিন্ন ধরনের খাদ্য (মূলত সুগার) বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় চলে যায় উদ্ভিদের পুরো দেহে। দেহের বিভিন্ন অংশ আবার সুগার থেকে স্টার্চ বা শ্বেতসার তৈরি করে। শক্তি হিসেবে এটি আবার চিনি থেকেও বেশি সুবিধাজনক। এগুলোকে খাদ্য হিসেবে খেয়ে বেঁচে থাকে তাবৎ দুনিয়ার প্রাণী।

তৃণভোজী কোনো প্রাণী, যেমন হরিণ বা খরগোশ, যখন কোনো উদ্ভিদকে খায়, তখন উদ্ভিদের শক্তিগুলোও তাদের দেহে যায়। শক্তিগুলো কাজে লাগে খাদ্য সংগ্রহ করা, সঙ্গীর সঙ্গে মিলন করা, বিপদে দৌড় দেওয়া, অন্যের সঙ্গে যুদ্ধ করা ইত্যাদিতে। উদ্ভিদ থেকে সংগ্রহ করলেও এই শক্তিগুলোর আদি বা মূল উৎস হচ্ছে সূর্য।

মাংসভোজী প্রাণীরা আবার তৃণভোজী প্রাণীদের খায়। ফলে এখানেও তৃণভোজী প্রাণীর শক্তি স্থানান্তরিত হয়ে চলে আসছে মাংসভোজী প্রাণীতে। এই শক্তিকেও মাংসভোজী প্রাণীরা বিবাদ, দৌড়, মিলন, গাছে চড়া ইত্যাদি কাজে লাগায়। যদিও কয়েকটা অতিরিক্ত ধাপ পার হয়ে আসছে; কিন্তু এখানেও শক্তির মূল উৎস হিসেবে থাকছে সূর্য।

যেসব ক্ষুদ্র প্রাণী মাংসভোজী প্রাণীর দেহে বসবাস করে বেঁচে থাকে, তাদের শক্তির উৎসও মূলত সূর্য। কোনো জীব যখন মারা যায় সেটি মাটিতে বিয়োজিত হয়। কখনো কখনো আবর্জনাভুক প্রাণীরা এদের দেহাবশেষ খেয়ে ফেলে। এমন ধরনের আবর্জনাভুক প্রাণীর উদাহরণ হচ্ছে গুবরে পোকা। ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাকও মৃতদেহকে খেয়ে শেষ করে ফেলতে পারে। এখানেও সেই আগের কথা, শক্তির মূল উৎস হচ্ছে সূর্য।

জ্বালানির জন্য আমরা কাঠ বা কয়লা বা তেল ব্যবহার করি। এদের সবগুলোর পেছনে জোগানদাতা হিসেবে আছে সূর্য। গাছ তো সরাসরি সূর্যের শক্তিকে ব্যবহার করেই বেড়ে ওঠে বা কাষ্ঠল হয়। মাঝে মাঝে কিছু গাছ ও গাছজাতীয় বস্তু খনিজ কয়লায় রূপান্তরিত হয়। এগুলোও জ্বালানি হিসেবে দারুণ। এখানেও মূল শক্তি সূর্য। একই প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় জ্বালানি তেল (জীবাশ্ম জ্বালানি)। এই তেল ব্যবহার করেই আজকালকার গাড়ি–ঘোড়া ও নানা মোটর চলে। এগুলোর ওপর ভর করেই দাঁড়িয়ে আছে আধুনিক যন্ত্রসভ্যতা। এখানেও শক্তির প্রাথমিক উৎস সূর্য।

আশুগঞ্জের তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও কাপ্তাইয়ের জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে দেশের বিদ্যুতের চাহিদার বড় একটা অংশ পূরণ করা হয়। তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে জ্বালানি গ্যাসের রাসায়নিক শক্তিকে ব্যবহার করে আর জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে পানির সঞ্চিত শক্তিকে (বিভব শক্তি) ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। এখানেও মূল শক্তির উৎস হিসেবে আছে সূর্য।

তেলের মতো করেই সূর্যের শক্তি সঞ্চয় করে জ্বালানি গ্যাস তৈরি হয়। তা নাহয় ঠিক আছে। কিন্তু পানির সঞ্চিত শক্তিতে সূর্য আসে কীভাবে? জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে মূলত পানিকে বাঁধ দিয়ে আটকে ওপর থেকে নিচে ফেলা হয়। ওপর থেকে কোনো কিছু নিচে পড়লে মহাকর্ষের টানে তার মাঝে গতিশক্তি তৈরি হয়। তা থেকে বিশেষভাবে প্রক্রিয়াজাত করে বিদ্যুৎশক্তি তৈরি করা হয়। এখন প্রশ্ন হলো পানিকে ওপরে নিচ্ছে কে? পানি ওপরে না উঠলে তো আর আমরা এই শক্তি পেতাম না।

পানিকে ওপরে নিচ্ছে মূলত সূর্য। পানিচক্র নামে অত্যন্ত চমৎকার একটি পদ্ধতিতে পানিকে বাষ্পে রূপান্তরিত করে বাতাসে ভাসিয়ে ওপরে নিয়ে যায় সূর্য। সেগুলো বৃষ্টি হিসেবে ঝরে পড়ে উঁচু অঞ্চলে। সেগুলো নদী বেয়ে নিচে নেমে আসে ধীরে ধীরে। পথে মানুষের কেউ কেউ বাঁধ দিয়ে কিছুটা সঞ্চিত শক্তি নিজেদের কাজে ব্যবহার করে নেয়।

বলতে থাকলে বলা শেষ হবে না। চারপাশের যেদিকেই তাকাই না কেন সবকিছুতেই আছে সূর্যের হাত। মাটি, পানি, পাতা, লতা, কাঠ, কয়লা, তেল, কাগজ, কাপড়, ফার্নিচার, হিটার, ফ্যান ইত্যাদি সবকিছুতেই দেখতে পাব সূর্যের অবদান, সূর্যের উপস্থিতি। পৃথিবীতে বসবাসের প্রতিটি মিনিটে আমরা সূর্যের কাছে ঋণী। শুধু আমরা নই, পৃথিবীর সব প্রাণই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সূর্যের কাছে ঋণী।

সূর্য যে আমাদের এত কিছু দিচ্ছে, খাইয়ে–পরিয়ে বাঁচিয়ে রাখছে, আমদের উচিত সূর্যকে নিয়ে আরও আরও গবেষণা করা। সূর্যের রহস্যকে ভেদ করা, সূর্য থেকে আরও আরও শক্তি বের করে আনা। সময়ে–সময়ে বিজ্ঞানীরা সূর্যকে বোঝার জন্য নানা মিশন পাঠিয়েছেন। এবার একদম সূর্যের কাছাকাছি থেকে সূর্যকে আবর্তনের জন্য পাঠাচ্ছেন একটি নভোযান। নাম পার্কার সোলার প্রোব। এটি যখন সূর্যকে আবর্তন করে সূর্য সম্বন্ধে অনেক তথ্য পাঠাবে, তখন সূর্যের অনেক রহস্য উন্মোচিত হবে আমাদের কাছে। সূর্যের রহস্য ভালোভাবে জানতে পারলে সামান্য হলেও শোধ হবে সূর্যের ঋণ।

লেখক: শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ

সূত্র : হোম সায়েন্স টুলস, ম্যাজিক অব রিয়্যালিটি, স্পেস ডট কম

 

Enjoyed this article? Stay informed by joining our newsletter!

Comments

You must be logged in to post a comment.