স্ত্রী নামা
--------------
বিশ পঁচিশ বছরের এক তরুনী তার সমস্ত অতীত, মধুর স্মৃতি, পারিবারিক সম্পর্ক এবং নিজের বেড়ে ওঠার পরিবেশ ছেড়ে তিনবার কবুল বলার পরিনতিতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অচেনা বা স্বল্প পরিচিত একজনের হাত ধরে নিজের সংসার রচনা করার জন্য এসে প্রায় সবারই স্বপ্ন ভঙ্গ দিয়ে যাত্রা শুরু করতে হয়।
শাশুড়ি তাঁর নিজের প্রথম জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা এতদিন সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মতো লুকিয়ে রাখলেও অনুকূল পরিবেশ পেয়ে ছোটখাটো ত্রুটি বা মতভেদের কারণে জীবন্ত আগ্নেয়গিরিতে রুপান্তরিত হন। অবিবাহিতা ননদ থাকলে তো কথা-ই নেই। কথায় আছে, একে রামে রক্ষা নেই তাতে সুগ্রীব দোসর। ভাবীকে সুযোগ পেলেই শুনিয়ে দেয়, "যার যার বাপের বাড়ি তার তার মাতবরি। বুঝে শুনে চলবা বউ।"
নতুন বউ বৈরী পরিস্থিতিতে স্বামী ছাড়া এসব কাকে বলবে। কিন্তু মা ভক্ত ছেলে সোজা বলে দেয়, তোমার জন্য আমি আমার মা বোনের সাথে ঝগড়া করতে যাবো না-কি? একটু মানিয়ে চলো, ছাড় দিতে শিখো।
ছাড় দিতে দিতে বেচারির একসময় মনে হয় এরচেয়ে ছাড়পত্র নিয়ে চলে যাবে কি-না। মনের কষ্ট কোনোদিন মা'কে জানালে মা বলেন, যুগে যুগে এরকমই চলে আসছে রে মা। তোর দাদী কি আমারে কম জ্বালিয়েছে? আমার অজান্তে তরকারিতে গোপনে গিয়ে এক খাবলা নুন দিয়ে নুনপোড়া সালুনের জন্য তোর বাপকে দিয়ে গায়ে হাত পর্যন্ত তুলিয়েছে। এ যুগে তো কপাল ভালো পুরুষের গায়ে হাত তোলা কমে গেছে। সহ্য কর। কি করবি ক। তোর বান্ধবী কতজনের বিয়ে এখনও হয় নি। ওদের বাপমায়ের চিন্তায় ঘুম আসে না। যতোই যা বলিস এ সমাজে অবিবাহিতা একটা মেয়ে নিজ স্বাধীন মতো বসবাস করার পরিবেশ আছে কিনা ভালো করেই তো জানো। তোকে মায়া করে এখানে জায়গা দিলে উপকারের চেয়ে তোর ক্ষতিই করা হবে। জামাই অপমানিত বোধ করবে। তার মনে জায়গা করে নিতে চেষ্টা করে যা। সেখানে যেদিন জয়ী হবি সেদিন সবকিছু তোর হাতের মুঠোয় আসবে। দেখিস না তোর বাপ বাইরে বড়ো বড়ো কথা যতো-ই বলুক ঘরে এসে একেবারে পোষা বাঘ। বুদ্ধি করে চললে তোরও একদিন এমন সময় আসবে। সিংহাসন নিজ ইচ্ছেয় কেউ ছেড়ে দেয় না মা। তা শাশুড়ি হোক বা সুলতান সোলায়মানই হোক। সেই সিংহাসন দখলের জন্য দরকার বেঁধে ছাড় দিবি কিন্তু ছেড়ে আসবি না। সেটা হবে তোর পরাজয়।
মেয়ে মায়ের কথা যৌক্তিক বুঝতে পারলেও সাথে সাথে এটাও বুঝে গেছে যে বিপদের দিনে খুশি মনে ও বাড়িতেও জায়গা দেবে না। তারচেয়ে এখানেই পায়ের নীচের মাটি শক্ত করতে হবে। সেই মাটির গভীরে শিকড় গেঁড়ে ডালপালা ছড়িয়ে শক্তি বৃদ্ধি করতে হবে।
হে পুরুষকুল, আপনাকে পঁচিশ ত্রিশ বছরের অতীত এবং সকল সম্পর্ক ত্যাগ করে শ্বশুর বাড়ি বৈরী পরিবেশে গিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করতে হচ্ছে না শুধু এ কারনেই সৃষ্টিকর্তাকে আপনার লাখো কোটি ধন্যবাদ জানানো উচিৎ। তারপর আবার জন্ম হয়েছে যুগ যুগ ধরে চলে আসা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার অনুকূল পরিবেশে। মুখে বা ভদ্রতা করে যে যাই বলুক, আপনি বিয়ে করে বৌ ঘরে আনেন, বিয়ে বসেন না। প্রথম যুদ্ধেই তো বিধাতা আপনাকে জিতিয়ে দিয়েছেন। জয়ী ব্যক্তি উদার হলে তার গ্রহনযোগ্যতা, মান ইজ্জত বাড়ে। পরিবেশ হয় শান্তিতে বসবাসের অনুকূল। যখন আপনার হাত ধরে বিশ্বাস করে ভরসা রেখে আসা মেয়েটি আপনার চোখের সামনেই নিগৃহীত হচ্ছে তখন তার পাশে না দাড়িয়ে মায়ের বিরুদ্ধাচরন করার মতো অনৈতিক কাজে নিজেকে জড়াবেন না এই অজুহাতে নিজ স্ত্রীর পাশে না দাড়িয়ে কাজটা কি ঠিক করেছেন বলুন তো? এটা কি চরম অনৈতিকতা নয়! আদৌ কি পুরুষসুলভ আচরণ এটা?
হ্যাঁ, প্রথম দু’একবার সত্যি কথা বললে আপনার মা হয়তো বলবেন, তুই তো কোনোদিন এরকম ছিলি না। বিয়ার পর তুই বৌয়ের ভেড়ুয়া হয়ে গেছিস। ঐ মেয়ে রুপে ভুলিয়ে তোকে আমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছে। মায়ের চেয়ে তোর কাছে বউ এখন বড়ো হলো! এমন ছেলে পেটে ধরেছিলাম আমি?
তখন মা'কে কাছে বসিয়ে জড়িয়ে ধরে যদি বলেন, "তুমি হলে আমার জন্মদাত্রী মা। তোমার পায়ের নীচে আমার বেহেশত। তোমার সাথে ওর তূলনা হয় কেমনে? মায়ের জায়গায় মা আর বৌয়ের জায়গায় বউ। তোমরা মিলেমিশে থাকলে ঘরে শান্তি থাকলে আমার কাজে কামে মন বসে। আয় উন্নতি বৃদ্ধি পায়। আর নিত্য ঝগড়া নিত্য নালিশ শুনলে আমার শান্তি নষ্ট হয় মা। তোমার ছেলের উন্নতি তুমি চাও না? তাহলে একটু তালমিল করে থাকো। তারে মেয়ের মতো দেখা লাগবে না, মেয়ের কাছাকাছি নজরে দেখে ভুল করলে শিখিয়ে দিও। ভালো কিছু করলে কাছে ডেকে দুটি মিষ্টি কথা বলে দেখো। তোমার কেনা বাঁদী হয়ে থাকবে। আমি আছি তোমার লগে। আর পরিস্থিতি এরকম হলে তোমার শান্তির জন্য হয় তাকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিতে হবে নাহলে আলাদা বাসা ভাড়া করে চলে যেতে হবে। আমি কিন্তু এর কোনোটিই চাচ্ছি না। তোমার উপর সব ভার দিলাম।"
মা কিন্তু যা বোঝার বুঝে যাবে। নতুন বিয়ে করা ছেলে বৌ ছাড়া দু'দিনও থাকতে পারবে কি-না এটা তাঁর ভালোই জানা। তাহলে বিকল্প তো একটাই। তা হলো আলাদা বাসায় উঠে যাওয়া। এটা তো একেবারে পরাজয়ের চুড়ান্ত। তার চেয়ে বাবা সমঝোতা করে বড়ো মুখ করে একসাথে মান ইজ্জত নিয়ে থাকা-ই মন্দের ভালো। প্রতিবেশী মহিলাদের কাছে ছোট তো হতে হলো না!
যে নারী পরম মমতায় বাবুইপাখির কুশলতায় আপনার বাসা সাজায়, আপনার সন্তানের মা হয়, যত্ন করে মশলার চেয়েও বেশি ভালবাসা মিশিয়ে উপভোগ্য খাবার রান্না করে সামনে এগিয়ে দিয়ে কৌতুহল নিয়ে অপেক্ষায় থাকে একটুখানি প্রশংসার। তাকে শেষ কবে ভালো রান্নার জন্য প্রশংসা করেছেন মনে পড়ে কি? শেষ কবে তাকে আই লাভ ইউ বা "ভালোবাসি সোনা" এটা বলেছেন মনে পড়ে কি?
সেলিব্রিটি নারীদের সাজপোশাক আর শরীরের উম্মুক্ত স্থানের প্রশংসা স্ত্রীর সামনে বসে বহুবার করলেও যেদিন তিনি আপনার সাথে বের হওয়ার জন্য সুন্দর করে সেজেছে তখন এগিয়ে গিয়ে কপালের টিপটা ঠিক জায়গায় লাগিয়ে একবারও কি বলেছেন তোমাকে সেই বিয়ের দিনের মতো সুন্দর লাগছে! এই সামান্য একটি কথা দিয়ে আপনি কিন্তু তার হৃদয়ের সবটুকু জয় করে নিতে পারেন। তারপরেও এতো কার্পণ্য কেন একবার নিজেকে প্রশ্ন করে দেখুন তো? এতে কি আপনি ছোট হয়ে যাবেন? মিথ্যে অহমিকায় অনেক বড়ো কিছু হারাচ্ছেন না তো!
সব নারীই দামী পোশাক, দামী গয়না, দেশ বিদেশে ঘুরতে গিয়ে শুধু টাকা অপচয় করতে চায় কথাটি কি আদৌ সত্যি! বরং আপনার প্রতি, আপনার সংসারের প্রতি, আপনার সন্তানের প্রতি তার যা অবদান তার আংশিক স্বীকৃতি আর একটুখানি মর্যাদা পাওয়ার জন্য তারা যুগের পর যুগ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে। কিন্তু হতাশা নিয়েই জীবন কেটে যায় অধিকাংশের।
বাতাসের অক্সিজেন, চাঁদের আলো আর নারীর প্রেমের মতো মহার্ঘ্য বস্তু বিনা পয়সায় পাওয়া যায় যদি একটু হৃদয়টা আমরা প্রসারিত করি।
হ্যাঁ বলতে পারেন, বিয়ের দিন থেকে আজ পর্যন্ত তার ভরনপোষণে টাকা খরচ করছেন না? তাহলে বিনা পয়সায় হলো কোথায়?
জবাবে বলবো আপনি অঙ্কে একেবারে কাঁচা। আমার শিক্ষক ও সহপাঠীরা স্বাক্ষী, আমি সবসময় অঙ্কে একশো পাওয়া ছাত্র। তাই আমার হিসেবে বলে, একজন গৃহিনী নারী দিনরাত উদয়াস্ত যে কৃচ্ছসাধন করে পরম মমতায় আপনার সংসারে শ্রম দেয় তার প্রকৃত আর্থিক মূল্য দিতে হলে আপনার আমার ক'জনের বেতনে বা আয়ে কুলাবে?
এ লেখা পড়ে কারো কারো মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে আমি কি এসব কথা মেনে চলি?
তার স্পষ্ট জবাব হলো, পুরোটা হয়তো পারি না। আগে হয়তো পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতায় অথবা সীমাহীন পেশাগত ব্যস্ততায় কখনো কখনো ভুলও হয়েছে। কিন্তু পারফর্মেন্স লেভেল কখনো শতকরা নব্বই ভাগের নীচে নামে নি। তাঁর কাজের যোগ্য স্বীকৃতি প্রকাশ্যে তো দেই-ই, ভালোবাসি কথাটা মুখ থেকে অহরহই বের হয়ে যায় বিনা দ্বিধায়।
আমার সবচেয়ে বড়ো বোনের বয়স আশি ছাড়িয়েছে। একদিন তিনি আমার উপর রাগ করে বলেন, তুই তো বৌর ভেড়ুয়া।
মনে করেছিলেন এটা বলায় আমি ক্ষিপ্ত হবো। আমি তখন হাসতে হাসতে বলি, বৌর ভেড়ুয়া হওয়ায় বড্ড সুখ। ক'জন পুরুষের এই ভাগ্য হয়! এমনই যেন থাকতে পারি দোয়া করো।
আসুন, আমরা পুরুষ হওয়ার আগে মানুষ হই। আমি নারীবাদীদের কখনো সমর্থন করি না। সকলে মানবতাবাদী হলে, মানবিক হলে এতো এতো বিভেদের দেয়াল কখনো গড়ে উঠতো না।
লিখাঃ শহিদুল ইসলাম।
*** এই লেখাটা সকল পুরুষেরর জন্য যেমন প্রযোজ্য নয় তেমনি সকল নারীর জন্যও প্রযোজ্য নয়। সকল মানবিক পুরুষকে যেমন সালাম জানাই তেমনি সংসারে অশান্তি সৃষ্টি করা এবং অন্যের সংসারে আগুন জ্বালানো নারীদের ধিক্কারও জানাতেও কোনো দ্বিধা নেই আমার।
You must be logged in to post a comment.