Top: যশোরের কৃষক হাসে ফুল চাষে

ফুলচাষি হযরত আলী ৭৫০টি গোলাপ ফুল নিয়ে যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী পাইকারি ফুলের মোকামে যান। সকাল আটটার মধ্যেই প্রতিটি ১৩ টাকা দরে সব গোলাপ কিনে নেন ব্যাপারীরা। এতে ভীষণ খুশি ঝিকরগাছার হাড়িয়া গ্রামের হয়রত আলী। তাঁর মতো অন্য ফুলচাষিদের মুখেও এখন চওড়া হাসি।   

১৪ ফেব্রুয়ারি পয়লা ফাল্গুন তথা বসন্ত উৎসব, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস এবং ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ও মহান শহীদ দিবস উপলক্ষে এক সপ্তাহ ধরে গদখালী পাইকারি ফুলের মোকামে চড়া দরে বিক্রি হচ্ছে গোলাপ। ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত গোলাপের দাম এ রকম চাঙা থাকলে করোনা মহামারি ও ঘূর্ণিঝড় আম্পানের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া যাবে বলে জানান ফুলচাষি ও ব্যবসায়ীরা।

গোলাপচাষি হযরত আলী বলেন, ‘চার দিন ধরে গোলাপের বাজার চাঙা। পাইকারি বাজারেই প্রতিটি গোলাপ ১০ থেকে ১৪ টাকা দরে বেচাকেনা হচ্ছে। এমন চাঙাভাব থাকলে করোনা পরিস্থিতির ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে আমরা আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারব।’

শুধু গোলাপ নয়; জারবেরা, রজনীগন্ধা, গাঁদা ও মল্লিকা ফুলের বাজারও কাছাকাছি সময়ের দিবস ও উৎসব উপলক্ষে বেশ চাঙা হয়ে উঠেছে। তবে গ্লাডিওলাস ফুলের আশানুরূপ দাম পাচ্ছেন না চাষিরা। যে কারণে গ্লাডিওলাসচাষিদের মন খারাপ। গদখালীর পাইকারি মোকামে প্রতিটি গ্লাডিওলাস ৪ থেকে ১০ টাকা দরে বেচাকেনা হচ্ছে, যা ৮ থেকে ১৫ টাকা হলে কৃষকেরা লাভবান হতেন বলে জানান।

ঝিকরগাছা উপজেলার নীলকণ্ঠনগর গ্রামের গ্লাডিওলাসচাষি ওসমান গনি বলেন, ‘পিংক (গোলাপি) রঙের ৬০০টি গ্লাডিওলাস নিয়ে বাজারে এসেছি। প্রতিটি ৬ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। অথচ করোনার আগে প্রতিটি ফুল ১২ থেকে ১৫ টাকা দরে বিক্রি হতো। গ্লাডিওলাস যে দামে বিক্রি করতে হচ্ছে, তাতে খরচই বাচতেছে না।’

গোলাপের দাম বেশি ও গ্লাডিওলাসের দাম কম হওয়ার কারণ জানতে চাইলে বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির সভাপতি আবদুর রহিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে বরাবরই গোলাপের কদর বেশি থাকে। এ জন্য দামটাও বাড়ে। আর গ্লাডিওলাস মূলত সামাজিক অনুষ্ঠানে বেশি ব্যবহৃত হয়। করোনার কারণে সামাজিক অনুষ্ঠান কম হচ্ছে বলে এই ফুলের দাম কমে গেছে। ফলে গোলাপচাষিরা লাভবান হলেও গ্লাডিওলাসচাষিরা লোকসানে পড়ছেন।’

সরেজমিনে গদখালী ফুলের বাজার ও আশপাশের এলাকার কয়েকটি মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরেই, অর্থাৎ ভোর সাড়ে পাঁচটা থেকেই চাষিরা তাঁদের খেতে উৎপাদিত গোলাপ, গাঁদা, রজনীগন্ধা, জারবেরা, মল্লিকা, গ্লাডিওলাস ও জিপসি ফুল মোটরসাইকেল, বাইসাইকেল, ভ্যানসহ বিভিন্ন যানবাহনে করে গদখালী পাইকারি ফুল মোকামে নিয়ে যান। সেখান থেকে ঢাকাসহ সারা দেশের ব্যাপারীরা এসব ফুল কিনে নেন। দু-তিন ঘণ্টার মধ্যেই মানে সকাল সাড়ে আটটার মধ্যেই শেষ হয়ে যায় প্রতিদিনের বেচাকেনা। এরপর ব্যাপারীরা পিকআপ, ট্রাক ও যাত্রীবাহী বাসের ছাদে করে ফুল নিয়ে ছোটেন ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়।

পয়লা ফাল্গুন, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ও শহীদ দিবস সামনে রেখে এবার কত টাকার ফুল বেচাকেনা হলো জানতে চাইলে বিএফএসের সভাপতি আবদুর রহিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘তিনটি দিবস উপলক্ষে ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ফুল বেচাকেনা শুরু হয়েছে। ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ফুলের বাজার এমন চাঙা থাকবে বলে আশা করছি। ডেলিভারি চালান অনুযায়ী সারা দেশে ইতিমধ্যে প্রায় ১৫ কোটি টাকার ফুল গেছে। সব মিলিয়ে এবার গদখালী মোকামে ১৮ থেকে ২০ কোটি টাকার ফুল বেচাকেনা হবে বলে আমরা ধারণা করছি।’

ঝিকরগাছা উপজেলার মানুষের আয়ের প্রধান উৎস ফুল চাষ। এর মাধ্যমেই এ অঞ্চলের বহু মানুষের ভাগ্য বদলে গেছে। গদখালী এলাকার ফুলের সৌরভ ইতিমধ্যে পার্শ্ববর্তী শার্শা, চৌগাছা, কেশবপুর ও সদর উপজেলায়ও ছড়িয়ে পড়েছে।

বিএফএসের তথ্য অনুযায়ী যশোর জেলায় মোট ১ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে ফুলের চাষ হচ্ছে। ফুল চাষের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন অন্তত ছয় হাজার কৃষক। গদখালী পাইকারি ফুলের মোকামে আছেন ২০০ জন ফুল ব্যবসায়ী। এ ছাড়া এখানে খুচরা ফুল বিক্রির ১১টি দোকান রয়েছে। ফুল চাষে কৃষকেরা সব মিলিয়ে প্রায় ১১৭ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন। এর মধ্যে ২৫০ হেক্টরে রজনীগন্ধা চাষে ১১ কোটি ২৫ লাখ, ২৩০ হেক্টরে গোলাপের আবাদে ২৫ কোটি ৮৭ লাখ, ৩৫০ হেক্টরে গ্লাডিওলাস চাষে ৩৯ কোটি ৩৭ লাখ, ৩০০ হেক্টরে গাঁদার আবাদে ১১ কোটি ২৫ লাখ ও ৩০ হেক্টরে জারবেরা চাষে ২৭ কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য ফুলের আবাদে বিনিয়োগ হয়েছে আরও প্রায় দুই কোটি টাকার।

বিএফএসের সভাপতি আবদুর রহিম বলেন, ফুল চাষ ও ব্যবসায়ে স্থানীয় ফড়িয়াদেরও কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করা আছে। বিভিন্ন ব্যাংক এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) প্রচুর অর্থায়ন করেছে। বাকি অর্থ কৃষকদের নিজস্ব।

এদিকে যোগাযোগ করা হলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের যশোর কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক দীপঙ্কর দাস বলেন, ‘গদখালী ফুলের মোকামে ফুল সংগ্রহ কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে। পানিসারা এলাকায় গ্লাডিওলাস ফুলের বীজ সংরক্ষণে হিমাগার ও আধুনিক ফুল মার্কেট স্থাপন করা হয়েছে। ফুলচাষিদের সহজ শর্তে ঋণ দিতে ব্যাংকগুলোকে অনুরোধ করা হয়েছে। মসলাজাতীয় কৃষিপণ্যের মতো ফুল চাষেও ৪ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব করেছি আমরা। এ ছাড়া ফুলচাষিদের সরকারের প্রণোদনা ঋণের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা দরকার।’

 

Enjoyed this article? Stay informed by joining our newsletter!

Comments

You must be logged in to post a comment.