খরচের সীমা নেতিবাচক—এ তথ্যই ব্যাখ্যার দাবি রাখে। শুনতে যত খটমট শোনায়, ব্যাপারটা ততটাই খটমট। গত মৌসুমের শুরুতে লা লিগার ২০টি ক্লাবের খরচের সীমা জানিয়ে দিয়েছিল লা লিগা কর্তৃপক্ষ। ক্লাবের খেলোয়াড়, কোচ ও স্টাফদের বেতন ও দলবদলের পেছনে সব খরচ সবই এই নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের মধ্যে করতে হবে।
বার্সেলোনার জন্য সে সীমা ছিল ৯ কোটি ৭৯ লাখ ইউরো। ব্যাপারটা বার্সেলোনার জন্য কত কঠিন, সেটা বোঝা যায় আরেকটি তথ্যে, আগের চুক্তিতে মেসি প্রায় ৭ কোটি ১০ লাখ ইউরো পেতেন। ক্লাবের দিকে চেয়ে মেসি নিজের বেতন অর্ধেক করতে চেয়েছিলেন। কারণ, লা লিগার নিয়মে এর চেয়ে বেশি কমানো সম্ভব নয় কারও বেতন।
বার্সেলোনা ও লাপোর্তা মেসিকে আশা দেখিয়েছেন এভাবেই চুক্তি করা সম্ভব। কিন্তু হঠাৎ জানানো হয়, আর্থিক সংগতির নীতি মানতে হলে অর্ধেক বেতনেও মেসিকে ধরে রাখা সম্ভব নয়। মেসিকে তাই ছেড়ে দিয়েছে বার্সেলোনা। ক্লাবে মেসির পরই সর্বোচ্চ বেতনভোগী দুই খেলোয়াড় আঁতোয়ান গ্রিজমানকে ধারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
মুফতে আনা হয়েছে মেম্ফিস ডিপাই, এরিক গার্সিয়া, সের্হিও আগুয়েরোদের (পরে অবসর নিয়ে নিয়েছেন)। কিন্তু তাঁদের নিবন্ধন করাতে ক্লাবের অধিনায়কদের বেতন কমাতে হয়েছে। জানুয়ারির দলবদলে তোরেস, পিয়েরে এমেরিক অবামেয়াং ও দানি আলভেজকে এনেছে বার্সেলোনা। তাদের চুক্তিবদ্ধ করতে বেতন কমিয়েছেন স্যামুয়েল উমতিতি, ধারে অ্যাস্টন ভিলায় পাঠানো হয়েছে ফিলিপ কুতিনিওকে।
এরই প্রভাব পড়েছে আগামী মৌসুমের বাজেটে। মৌসুমের শুরুতে খরচসীমায় বার্সেলোনার চেয়ে বাজে অবস্থায় ছিল আরও অনেক ক্লাব। সবচেয়ে কোণঠাসা অবস্থায় ছিল লেভান্তে। সে দলও তাদের বাজেট ১৭ লাখ ইউরো বাড়িয়ে আগামী মৌসুমের বাজেট ৩ কোটি ৩৮ লাখ ইউরো করেছে। আর বার্সেলোনার খরচের সীমা দাঁড়িয়েছে ১৪ কোটি ৪০ লাখ ইউরো। কিন্তু এই অঙ্কের সামনে ঋণাত্মক একটি চিহ্নও আছে। অর্থাৎ, বার্সেলোনার খরচসীমা আগামী মৌসুমে (-) ১৪ কোটি ৪০ লাখ ইউরো।
একটি দল নেতিবাচক খরচ কীভাবে করবে, সেটা বাস্তবে ব্যাখ্যা করা কঠিন। ধরা যাক, বার্সেলোনার প্রতি ভালোবাসা দেখিয়ে ক্লাবের খেলোয়াড়, কর্মকর্তা, কোচ—কেউই বেতন নিলেন না (আইনত সেটা কখনোই সম্ভব নয়, মেসিকে এ কারণে বিনা মূল্যে খেলার প্রস্তাব দিতে পারেনি বার্সেলোনা)। ক্লাবের মূল স্কোয়াডের পেছনে কোনো অর্থও ব্যয় করা হলো না। দলবদলেও নতুন খেলোয়াড়েরা সবাই এলেন মুফতে। এভাবে কিছু অসম্ভব আর কিছু প্রায় অসম্ভব কাজের পরও বার্সেলোনার খরচ শূন্য হবে, ঋণাত্মক তো করা সম্ভব নয়!
খরচসীমা আতলেতিকো মাদ্রিদেরও কমে এসেছে। গত মৌসুমে ১৭ কোটির ইউরোর সীমা ১৬ কোটিতে নেমে এসেছে তাদের। লিগে দুইয়ে থাকা সেভিয়ার ১২ লাখ ইউরো কমে হয়েছে ১৯ কোটি ৯১ লাখ। কিন্তু রিয়াল মাদ্রিদ তাদের অবস্থান ধরে রেখেছে। গত মৌসুমের মতো আগামী মৌসুমেও মূল স্কোয়াডের খরচ ও দলবদলের জন্য ৭৩ কোটি ৯১ লাখ ইউরো সীমা পাচ্ছে রিয়াল মাদ্রিদ। ফলে, আগামী দলবদলে তাদের মূল দুই লক্ষ্য কিলিয়ান এমবাপ্পে ও আরলিং হরলান্ডকে পেতে আর্থিক দিক থেকে অন্তত কোনো বাধা নেই।
কিন্তু বার্সেলোনাও তো হরলান্ডকে পেতে চায়। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যমের গুঞ্জন অনুযায়ী হরলান্ডের এজেন্ট মিনো রাইওলা তাঁকে বার্সেলোনাতেই নিতে বেশি আগ্রহী। কিন্তু নেতিবাচক খরচসীমা নিয়ে তাঁকে কীভাবে কিনবে বার্সেলোনা? নরওয়েজিয়ান খেলোয়াড়ের বেতনের আকাঙ্ক্ষা তো বেশ চড়া বলেই শোনা যাচ্ছে। আর এই স্ট্রাইকারকে নিশ্চয় মুফতে ছাড়বে না তাঁর ক্লাব বরুসিয়া ডর্টমুন্ড!
এ ব্যাপারে লা লিগার মহাপরিচালক হাভিয়ের গোমেজ একটা উপায় বাতলে দিয়েছেন, ‘খেলোয়াড় কিনতে হলে বার্সেলোনাকে বর্তমানের খরচ কমাতে হবে বা নতুন আয়ের উপায় বের করতে হবে। এ ছাড়া আর উপায় নেই। বার্সেলোনার যে আয়ের ক্ষমতা, তার চেয়ে বেশি লস হচ্ছে। এ কারণেই খরচের সীমা ঋণাত্মক।’
এই মৌসুমে বার্সেলোনা কোনো খেলোয়াড়কে চুক্তিবদ্ধ করার আগে কঠিন এক নিয়ম মানতে হয়েছে। আর তা হলো, খেলোয়াড় বিক্রি করে বা ধারে পাঠিয়ে যে অর্থ বাঁচবে তার চার ভাগের এক ভাগ ব্যবহার করতে পারবে। যত দিন না ক্লাবের প্রকৃত ব্যয় লা লিগা নির্ধারিত খরচসীমার (যা আগামী মৌসুমে ঋণাত্মক!) নিচে নামছে, তত দিন এই উপায়েই খেলোয়াড় টানতে হবে বার্সেলোনাকে।
গোমেজ সেটা আবার মনে করিয়ে দিয়েছে, ‘বার্সেলোনা তাদের মূল্যমান যত দিন পুনরুদ্ধার করতে পারবে না, তত দিন ১: ৪, এই উপায়েই খরচ করতে পারবে। আপনি ১ কোটি টাকা আয় করলে ২৫ লাখ খরচ করবেন। যত দিন আয় বাড়াতে পারবে না, বার্সেলোনার পক্ষে খেলোয়াড় আনার উপায় হলো, খেলোয়াড়ের চুক্তিতে খরচ কমানো।’
ইংলিশ ও জার্মান মিডিয়ার দাবি, হরলান্ডকে ১০ কোটি ইউরোতে কেনার প্রস্তাব দিচ্ছে ম্যানচেস্টার সিটি। রিয়াল মাদ্রিদও সে দৌড়ে আছে। তবে বাজারে গুঞ্জন, হরলান্ডের চুক্তিতে একটি শর্ত আছে, যা অনুযায়ী ২০২২ সালের জুলাইয়ে তাঁকে ৭ কোটি ৫০ লাখ ইউরো দিয়ে কিনতে পারবে অন্য ক্লাব। সে ক্ষেত্রেও বার্সেলোনাকে খেলোয়াড় বিক্রি করে ও অন্য খেলোয়াড়দের বেতন কমিয়ে ৭ কোটি ৫০ লাখের চার গুণ বা ৩০ কোটি ইউরো আয় দেখাতে হবে।
কিছুদিন আগেই স্পটিফাইয়ের সঙ্গে ২৮ কোটি ইউরোর চুক্তি করেছে বার্সেলোনা। কুতিনিও ও গ্রিজমানকে বিক্রি করে ৯ কোটি ইউরোর মতো পাবে বার্সেলোনা। এতে সমর্থকেরা তাই হরলান্ডকে নিয়ে আশা দেখা শুরু করেছিলেন। কিন্তু হরলান্ডের বেতন ও বোনাস মিলিয়ে অঙ্কটা ৭ কোটি ৫০ লাখ ইউরোর অনেক বেশি হয়ে যাবে।
সে কারণেই লাপোর্তা রোববার জানিয়ে দিয়েছেন, আর্থিক ঝুঁকির মুখে হরলান্ডকে আনবে না বার্সেলোনা, ‘আমরা একটা ফুটবল ক্লাবকে ভালোভাবে সামলাতে এসেছি। এমন এক পর্যায়ে আছি, যেখানে আর্থিকভাবে ভালো করলেও এখনো সমস্যার সমাধান হয়নি। আর্থিক সমস্যার সমাধান এখনো হয়নি এবং এটাই প্রাধান্য পাচ্ছে। আমরা শক্তিশালী এক দল গড়তে চাই। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব, কিন্তু ক্লাবকে বিপদে ফেলে কাউকে আনব না।’
You must be logged in to post a comment.