ইউক্রেনে সম্ভাব্য রুশ সামরিক আগ্রাসন নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর উত্তেজনা চলছে। উত্তেজনা প্রশমনে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ। মস্কো ও কিয়েভ সফর শেষে সম্প্রতি তিনি বলেন, ইউক্রেন মিনস্ক চুক্তি কার্যকরে আগ্রহী। এর এক দিন পরই কিয়েভ পূর্বের অবস্থানের কথা জানিয়ে বলে, দনবাসের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসবে না তারা। জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় হওয়া মিনস্ক চুক্তির একটি পক্ষ দনবাস। ইউক্রেন এমন কথা জানানোর পরই কিয়েভের রাজনৈতিক দুঃসাহসিকতাকে কারা উৎসাহিত করছে এবং কারা পূর্ব ইউক্রেনের সংঘাত তৈরি করছে—এসব প্রশ্ন উঠেছে। খবর স্পুতনিকের।
২০০৯-১৪ সাল পর্যন্ত ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ছিলেন নিক গ্রিফিন। ব্রিটিশ এই রাজনীতিক বলছেন, ইউক্রেনকে সামরিক সরঞ্জাম, সামরিক প্রশিক্ষক দিয়ে এবং নৈতিক–রাজনৈতিকভাবে সমর্থন দিচ্ছে পশ্চিমা দেশগুলো। পশ্চিমের সমর্থন পেয়ে কিয়েভ ভাবছে, তারা পূর্বাঞ্চলের দুই স্বঘোষিত প্রজাতন্ত্র এবং রাশিয়াকে মোকাবিলা ও হুমকি দিয়ে যেতে পারবে। তিনি আরও বলেন, পশ্চিমারা চায় না, কিয়েভ চুক্তি মানুক। রাশিয়া ও ইউক্রেনের মানুষ একে অপরকে মারুক, এটাই দেখতে চায় তারা।
ইউক্রেন নিয়ে উত্তেজনার মধ্যে ৯ ফেব্রুয়ারি দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিমিত্র কুলেবা মিনস্ক চুক্তি প্রসঙ্গে বলেন, মস্কোর শর্তে তারা কিয়েভ মিনস্ক চুক্তি মেনে চলবে না এবং বিচ্ছিন্ন স্বঘোষিত দোনেৎস্ক ও লুগানস্ক পিপলস রিপাবলিকের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসবে না। অথচ চুক্তির প্রধান শর্তগুলোর মধ্যে এটি ছিল একটি।
ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের সাবেক সদস্য নিক গ্রিফিন ইউক্রেনকে চুক্তি মেনে চলতে উৎসাহী করতে পশ্চিমাদের সদিচ্ছার কথাও বলেন। তাঁর মতে, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই যে যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলো ইউক্রেনের নেতৃত্বকে ২০১৪ ও ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত মিনস্ক চুক্তি কার্যকরে বাধ্য করতে পারত।
গ্রিফিন পূর্ব ইউক্রেনের স্বঘোষিত দুই প্রজাতন্ত্রের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, পশ্চিমারা শুধু এটা স্পষ্ট করে দিয়ে যদি বলে যে সেখানে (পূর্ব ইউক্রেনে) কদর্য ও অবৈধ শাসন তাদের নিজেদের এবং তারা আর কোনো সামরিক, লজিস্টিক, আর্থিক বা রাজনৈতিক সমর্থন পাবে না। এটাই কিয়েভকে সঠিক কাজ করতে বাধ্য করবে।
পিটসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড্যান কোভালিকের মতে, পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর ভণ্ডামিতে এ সত্য উন্মোচিত হয়েছে যে তারা মিনস্ক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে, নয়তো আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন দিয়েছে। অধ্যাপক ড্যান কোভালিক এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, যখন থেকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ চুক্তির অনুমোদন দিয়েছে, তখন থেকে এ চুক্তি আন্তর্জাতিক আইন। এক দিকে রাশিয়ার সঙ্গে মিনস্ক চুক্তির নরম্যান্ডি ফরম্যাট হিসেবে পরিচিত জার্মানি, ফ্রান্স, জামিনদার হিসেবে চুক্তিতে সমর্থন করেছে, অপর দিকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে চুক্তিটি অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য।
অধ্যাপক কোভালিক ইউক্রেনের সরকারের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে দাবি করে বলেন, ‘কিয়েভ সরকার অংশত যুক্তরাষ্ট্রের সৃষ্টি। এরা ২০১৪ সালে ইউক্রেনের অভ্যুত্থানে সমর্থন দিয়েছিল। আর এ সরকারের উত্থানের সহযোগী ছিল যুক্তরাষ্ট্র। তাই কিয়েভের বর্তমান সরকার সেটাই করবে, যেটা যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছে।’
কিয়েভ ও পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলো এত দিন মিনস্ক চুক্তি অগ্রাহ্য করে নিজেদের পায়েই কুড়াল মেরেছে। এমন কথা বলছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক গ্লোবাল পলিটিক্যাল ইনসাইটের প্রতিষ্ঠাতা আলেক্সান্ডার ল্যাকসন। তিনি বলেন, প্রথমত, কিয়েভের মিনস্ক চুক্তির দীর্ঘস্থায়ী অন্তর্ঘাত থেকে উদ্ভূত ইউক্রেন সংকট ইতিমধ্যে দেশটির অর্থনীতিতে বড় রকম নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ল্যাকসন আরও সতর্ক করে বলেন, দ্বিতীয়ত, ইউক্রেনে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক উত্তেজনার ঝুঁকির মুখে রয়েছে ইউরোপ। ইউক্রেনের এ সংকট ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) জোটভুক্ত দেশগুলোতে, অর্থাৎ ইউরোপের অন্যত্রও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
মিনস্ক চুক্তির প্রধান একটি শর্ত ছিল পূর্ব ইউক্রেন থেকে সামরিক স্থাপনা, সামরিক সরঞ্জাম ও ভাড়াটে সেনাদের সরিয়ে নিতে হবে। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ইউক্রেনে এখনো প্রায় ১০ হাজার বিদেশি সামরিক বিশেষজ্ঞ স্থায়ীভাবে রয়ে গেছেন। এই সেনাসদস্যদের মধ্যে চার হাজারই যুক্তরাষ্ট্রের।
বাইডেন প্রশাসনের অধীন যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা ইউক্রেনে অস্ত্র সরবরাহ আরও বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো ইউক্রেনকে ন্যাটোর সদস্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কয়েক মাস ধরে ইউক্রেন সরকার দনবাসের সঙ্গে যুক্ত এলাকাগুলোতে সামরিক সরঞ্জাম ও সেনা সমাবেশ বাড়িয়েছে। কিয়েভের এমন পদক্ষেপ স্পষ্টত মিনস্ক চুক্তির লঙ্ঘন। গত বছরের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর কাছে খসড়া একটি নিরাপত্তা চুক্তি উত্থাপন করে মস্কো। খসড়া ওই চুক্তিতে ইউক্রেনকে ন্যাটোর সদস্য করা এবং রাশিয়ার সীমান্তে কিয়েভের সামরিক স্থাপনা তৈরির বিষয়টি তুলে ধরা হয়। রাশিয়া তখনই যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোকে জানায়, রুশ সীমান্তে ইউক্রেন সেনা সমাবেশ ঘটিয়ে ‘রেড লাইন’ অতিক্রম করেছে এবং এতে পাল্টা সামরিক জবাব দেওয়ার অধিকার তৈরি হয়েছে তাদের।
আলেক্সান্ডার ল্যাকসন বলছেন, যদি ইউক্রেন মিনস্ক চুক্তি মেনে না চলে, তাহলে খোলাখুলিভাবে এটা বলা যায় যে ইউক্রেন সংকট চলতেই থাকবে। টেবিলে থাকবে শুধু সামরিক সমাধান। এতে শুধু ইউক্রেনের ওপরই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না, নেতিবাচক প্রভাব পড়বে ইউরোপেও। কারণ ইউরোপের ভূখণ্ডে এটা হয়ে উঠবে টগবগে এক সংঘাত। এ জন্য যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর মিনস্ক চুক্তি মেনে চলতে ইউক্রেনকে রাজি করানো খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে এটা ভাবতে হবে যে ইউক্রেনের সংকট নিরসনের জন্য চুক্তি তো ২০১৪ ও ২০১৫ সালেই হয়েছে। এখন সংকট নিরসনে শুধু চুক্তির শর্ত মেনে চলাটাই ব্যাপার।
You must be logged in to post a comment.