ভার্চ্যুয়াল এক জগৎ। ওর ভেতরে ঘুরে বেড়াচ্ছে তোমার ত্রিমাত্রিক প্রতিরূপ। কথা বলছে, হাঁটছে, প্রয়োজনে অফিসও করছে তোমার আঙুলের ইশারায়। এ রকমই এক নতুন জগতের কথা বলেছেন মার্ক জাকারবার্গ কিছুদিন আগে। গত বছর, ২০২১ সালের নভেম্বরে। নতুন এ জগতের নাম মেটাভার্স। বাংলায়, মেটাবিশ্ব।
‘মেটা’ শব্দটা যাদের পরিচিত লাগছে, তারা নিশ্চয়ই শুনেছ ডিসি কমিকসের চরিত্র দ্য ফ্ল্যাশের নাম। টিভি সিরিজও আছে তাকে নিয়ে। না, ফ্ল্যাশের জগৎটা ভার্চ্যুয়াল নয়। তবে সে জগতে মানুষের পাশাপাশি বাস করে মেটাহিউম্যানরা। মেটামানব। কণাত্বরক যন্ত্রের বিস্ফোরণের ফলে প্রচুর রেডিয়েশন ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। যাঁদের আঘাত করে, বদলে যায় যায় তাঁদের ডিএনএ। এদের কেউ হয়ে ওঠেন গতিদানব, কেউবা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন আবহাওয়া। এদের কেউ সুপারহিরো, আবার কেউ খলনায়ক। ফ্ল্যাশ নিজেও গতিদানব। এবং গল্পের নায়ক। কিংবা খলনায়কও। যে তার মাকে বাঁচাতে গিয়ে বারবার এলোমেলো করে ফেলে মহাবিশ্বের টাইমলাইন বা সময়রেখা। সে আরেক গল্প। কল্পগল্পের অত ভেতরে না যাই। প্রসঙ্গে ফিরি।
মেটাবিশ্বের জগতে তুমিও নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে ভার্চ্যুয়াল জগতের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য। ছোট্ট একটি মাউস ক্লিক বা আঙুলের ইশারাই যথেষ্ট সে জন্য। এ যেন কল্পবিজ্ঞানের জগৎ। বাস্তবতা যেখানে কল্পনার সঙ্গে মিশে যাবে এক সুতায়।
এ জন্য ফেসবুক—থুক্কু, মেটাবিশ্বের প্রধান কর্মকর্তা মার্ক জাকারবার্গ জানিয়েছেন তিনটি প্রযুক্তির কথা। এই প্রযুক্তিগুলো নিয়ে তাঁরা বর্তমানে কাজ করছেন।
এক, ভার্চ্যুয়াল রিয়েলিটি (ভিআর)। কোয়েস্ট নামে ভার্চ্যুয়াল রিয়েলিটি হেডসেট বা ভিআর হেডসেট, মানে চশমার মতো এক ধরনের যন্ত্র পরে তুমি চাইলে প্রবেশ করতে পারবে মেটাভার্সের এই ভার্চ্যুয়াল জগতে। পড়াশোনা থেকে শুরু করে কনসার্ট বা আড্ডা—সবকিছুই অনুভব করা যাবে এর মাধ্যমে। বাসায় বসে তুমি ভিডিও কলে এখন যেভাবে কথা বলো, তখনো কথা বলবে সেভাবেই। পার্থক্য হলো, কাজটা বাস্তবে যেভাবে করতেন, ঠিক সেভাবেই করবে তুমি।
পড়াশোনার বিষয়টা নিয়ে যদি ভাবি, সহপাঠীদের পাশে যেভাবে বসে পড়তে হয়, তুমি সেভাবেই বসে পড়বে। আর, এর একটা প্রজেকশন (মানে, ভার্চ্যুয়াল রূপ) দেখাবে তোমার ত্রিমাত্রিক প্রতিরূপ। দেখতে পাবে তোমার সহপাঠীরা। একইভাবে, ভার্চ্যুয়াল রিয়েলিটিতে ব্যায়াম করতে চাইলে চশমার মতো ভিআর যন্ত্রটা চোখে লাগিয়ে তুমি ব্যায়াম করবে জিম ইন্সট্রাকটর বা ব্যায়ামাগারের দায়িত্বশীলের নির্দেশনা অনুযায়ী। তিনি তোমার ত্রিমাত্রিক প্রতিরূপের কাজকর্ম দেখে বলে দেবেন, ব্যায়াম ঠিকভাবে হচ্ছে, নাকি ভুল হচ্ছে কোথাও। (কীভাবে, সে কথায় আসছি একটু পরে।)
দ্বিতীয় উপায়টির নাম অগমেন্টেড রিয়েলিটি (এআর)। শুনতে প্রায় এক শোনালেও ভার্চ্যুয়াল রিয়েলিটির সঙ্গে অগমেন্টেড রিয়েলিটির মৌলিক পার্থক্য আছে। ভিআর হেডসেট পরে তুমি প্রবেশ করবে পুরোপুরি ভার্চ্যুয়াল এক জগতে। যত দূর দেখতে পাবে, পুরো ৩৬০ ডিগ্রি দৃষ্টিসীমাজুড়ে থাকবে সেই ভার্চ্যুয়াল জগৎ।
আর অগমেন্টেড রিয়েলিটি হলো, তোমার ঘরে, তোমার বাস্তব জগতে সে কিছু এলিমেন্ট বা জিনিস যুক্ত করবে। যাঁরা পকেমন গো গেমসটা খেলেছ, তারা বিষয়টা বুঝতে পারবে। কিংবা চিন্তা করতে পারো মারভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্সের (এমসিইউ) টনি স্টার্কের ল্যাবের হলোগ্রাম মডেলগুলোর কথা। যেখানে টনি স্টার্ক নিজের আয়রনম্যান স্যুটের জন্য হলোগ্রাফিক প্রজেকশন বা প্রতিরূপ ব্যবহার করে নতুন মৌল বানাচ্ছেন। কিংবা ক্যাপ্টেন আমেরিকা: সিভিল ওয়ার চলচ্চিত্রের শুরুতে টনি স্টার্ক তাঁর বাবা-মায়ের সঙ্গে যে কাল্পনিক কথোপকথন দেখান এমআইটির শিক্ষার্থীদের, সেটা। অগমেন্টেড রিয়েলিটি অ্যাপ এবং ক্যামেরা ব্যবহার করে ফোনের স্ক্রিনেই তুমি এই ‘বাড়তি বাস্তবতা’টুকু দেখতে পাবে। আর, স্মার্ট এআর গ্লাস ব্যবহার করলে সেই অভিজ্ঞতাটা হবে আরও চমৎকার!
ফেসবুক, উঁহু ভুল হলো—মেটা সেটা নিয়ে কাজ করার জন্য বানিয়েছে স্পার্ক এআর প্ল্যাটফর্ম। এই প্ল্যাটফর্মে তুমি নানারকম ভার্চ্যুয়াল এলিমেন্ট বানাতে পারবে, যা বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের মানুষ দেখতে পাবে ফোনের এআর অ্যাপে কিংবা স্মার্ট এআর গ্লাসের মাধ্যমে।
তৃতীয় উপায়টির নাম, স্মার্ট গ্লাস। ভিআর হেডসেট বলো বা স্মার্ট এআর গ্লাস, সবই আসলে স্মার্ট গ্লাস। অর্থাৎ, ভার্চ্যুয়াল বা অগমেন্টেড রিয়েলিটির জগতে বিচরণ করা বা অনুভব করা যায় এ সব চশমা ব্যবহার করে। কিন্তু আলাদা করে মেটা এখানে স্মার্ট গ্লাস বলতে বোঝাচ্ছে সাধারণ চশমা দিয়ে করা যায় না, এ রকম দারুণ কিছু কাজ করতে পারে, এমন এক ধরনের চশমাকে। বিষয়টা খানিকটা স্মার্ট ওয়াচের মতো। এই চশমার মাধ্যমে তুমি গান শুনতে পারবে, দেখতে পারবে যেকোনো ভিডিও। ফোন ধরতে পারবে, ভিডিও কলে কথা বলতে পারবেন, রেকর্ডও করতে পারবেন কিছু চাইলে। সেটা তাৎক্ষণিক শেয়ারও করা যাবে মেটাভার্স প্ল্যাটফর্মে। মোট কথা, যেসব কাজ তুমি এখন মোবাইল ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে করো, যেমন স্ক্রিনে ভিডিও দেখো, তা সরাসরি করতে পারবেন এই চশমায়।
এ জন্য মেটা বানাচ্ছে ‘রে-বেন স্টোরিজ’ নামের এক ধরনের স্মার্টগ্লাস। বলা বাহুল্য, ‘রে-বেন’ একটি বিখ্যাত চশমা ব্র্যান্ডের নাম। তারা কাজ করছে মেটার সঙ্গে মিলে।
এটুকু হলো মেটাভার্সের ফ্রন্টএন্ড টেকনোলজি। অর্থাৎ ব্যবহারকারীরা কীভাবে মেটাবিশ্বে প্রবেশ করবেন, কীভাবে সেটা অনুভব করবেন বা এর কাজকর্মে অংশ নেবেন, তা।
প্রায় কল্পনার মতো এই বাস্তবতা যেন হাতছানি দিচ্ছে আমাদের। অন্তত মার্ক জাকারবার্গ এমনটাই বলেছেন গত নভেম্বরে। আসলেই কি বিষয়টা সে রকম? জাকারবার্গ আমাদের যে মেটাবিশ্বের গল্প শুনিয়েছেন, বাস্তবে তার কতটা আসলেই করতে পারবে মেটা? সেটা বোঝার জন্য প্রযুক্তিগুলোর আরেকটু গভীরে উঁকি দেওয়া প্রয়োজন।
দুই
মেটাভার্স বা মেটাবিশ্ব কথাটা প্রথম ব্যবহার করা হয় ১৯৯২ সালের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস স্নো ক্র্যাশ-এ। কথাটা ফেসবুক, তথা মেটা এখন নতুনভাবে ব্যবহার করছে সত্যি, কিন্তু এ রকম মেটাবিশ্ব নিয়ে কাজ করেছে বেশ কিছু গেম কোম্পানি আগেও। উদ্দেশ্য ওটাই ছিল, ব্যবহারকারীদের জন্য একটা সম্পূর্ণ ভার্চ্যুয়াল বিশ্ব তৈরি করা। যেখানে গেম খেলার পাশাপাশি সামাজিক বিভিন্ন কাজকর্মেও অংশ নেওয়া যাবে। ফেসবুক বা মেটা যে মেটাবিশ্বের কথা বলেছে, এটি মূলত দ্বিতীয় বিষয়টি, অর্থাৎ সামাজিক কাজকর্মকে মূল লক্ষ্য ধরে নিয়েই গড়ে তুলছে তারা। তবে বর্তমান অনেক ভিডিও গেমেই এ ধরনের ভার্চ্যুয়াল বিশ্ব আছে। আছে অনেক চলচ্চিত্রেও। যেমন ফোর্টনাইট ভিডিও গেম। যাঁরা গেমটি খেলেননি, এ প্রসঙ্গে তাঁদের বোঝার জন্য বলা যায় কিছুদিন আগে মুক্তি পাওয়া রেডি প্লেয়ার ওয়ান চলচ্চিত্রটির কথা।
কিন্তু ঘুরেফিরে আমাদের ফিরে যেতে হবে সেই মূল প্রশ্নটিতে। ‘মেটাবিশ্ব’ আসলে কী? এই প্রশ্নের উত্তর এই ২০২২ সালে বসে দেওয়া, আর ১৯৭০ সালে বলে ‘ইন্টারনেট’ কী, তা বোঝার চেষ্টা করার সঙ্গে খুব বেশি পার্থক্য নেই। কারণ, জিনিসটা যে আসলে কী, এ বিষয়টা স্পষ্ট না প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের কাছেও। কেন? বলছি।
ভার্চ্যুয়াল রিয়েলিটির কথাই ধরো। ওতে যে অ্যাভাটার বা মানুষের প্রতিরূপ থাকে, সেটা তৈরি হয় যে মানুষটির প্রতিরূপ বানানো হচ্ছে, তার অনুকরণে। এখানে আমি গেম বা ফেসবুকে এখন কার্টুনের মতো যে ধরনের অ্যাভাটার দেখা যায়, যেটাকে ব্যবহারকারীরা নিজের মতো করে কাস্টমাইজ করে নিতে পারেন, তার কথা বলছি না। এ জিনিস তো এখনই আছে! এর জন্য আলাদা মেটাবিশ্বের আসলে প্রয়োজন নেই। ফেসবুক, মানে মেটা এরকম ভার্চ্যুয়াল রিয়েলিটির কথা বলেওনি। বলেছে হলোগ্রাফিক প্রজেকশনে দেখা যাবে, এরকম প্রতিরূপের কথা। হলোগ্রামের মাধ্যমে এই ভার্চ্যুয়াল প্রতিরূপটি অংশ নিতে পারবে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় বা যেকোনো কনসার্টে। সেই আড্ডা বা কনসার্টে তাকে দেখা যাবে হলোগ্রাম হিসেবে।
‘মেটা’ তাদের মেটাভার্স নিয়ে প্রকাশিত ভিডিওগুলোর একটিতে দেখিয়েছে, একটি মেয়ে নিজের বাসায় সোফায় বসে স্ক্রল করছে ইনস্টাগ্রামে। সেখানে সে দেখতে পায়, তার এক বন্ধু ছবি দিয়েছে, পৃথিবীর অন্য প্রান্তে একটি কনসার্ট হচ্ছে। ওই দৃশ্যটির ওখানেই শেষ। পরের দৃশ্যে দেখা যায়, মেয়েটি হলোগ্রাম হিসেবে চলে এসেছে সেই কনসার্টে। গল্প করছে, আনন্দ করছে তার সেই বন্ধুর সঙ্গে, যে সশরীর উপস্থিত আছে কনসার্টটিতে। কথা হলো, ফেসবুক এটা কীভাবে করবে?
স্যামসাংয়ের স্মার্ট ওয়াচগুলো এখন মানুষের ওজন বা শরীরে চর্বি বা কোনো উপাদান কী পরিমাণে আছে, তা বোঝার জন্য ইলেকট্রিক সিগন্যাল পাঠায়। পুরো দেহ ঘুরে সিগন্যাল আবার এসে পড়ে ঘড়ির সেন্সরে। সেই তথ্য থেকে এটি বের করতে পারে, কার দেহে চর্বি কতটা জমেছে বা ওজন কত ইত্যাদি। এ রকম কোনো প্রযুক্তির মাধ্যমে কি ফেসবুক এটা করবে? আসলে, এ ধরনের প্রযুক্তির মাধ্যমে একজন মানুষের বিভিন্ন অভিব্যক্তি বা এক্সপ্রেশন বোঝাটা সম্ভব না এখনো। সে জন্য বিভিন্ন ধরনের বেশ কিছু মোশন সেন্সর লাগাতে হবে দেহের বিভিন্ন জায়গায়, বিশেষ করে মুখে। অর্থাৎ বিষয়টা বেশ জটিল হয়ে যাচ্ছে এখানে এসে। কারণ, এ ধরনের সেন্সর মুখে-হাতে-পায়ে প্রতিনিয়ত লাগিয়ে রাখাটা আসলে বাস্তব চিন্তা না। তার ওপর অনেকেই বলেছেন, এ ধরনের সেন্সর ও ভিআর গ্লাস দীর্ঘ সময় পরে থাকার অভিজ্ঞতা খুব সুখকর নয়। মোশন সিকনেস, মানে, যে তলে (মেঝেতে) দাঁড়িয়ে আছে, তার তুলনায় নিয়মিত এলোমেলো নড়াচড়া করলে এই নড়াচড়ার জন্য অসুস্থ বোধ করে অনেকেই। ব্যথা বা শারীরিক কষ্ট হওয়ার কথাও জানিয়েছে অনেকে। তার ওপর রাস্তাঘাটে এ ধরনের ভিআর বা এআর গ্লাস বা হেডসেট পরে চলাচল করার মতো উদ্ভট বিষয়গুলো তো আছেই।
সে ক্ষেত্রে শুধু ত্রিমাত্রিক অ্যাভাটার কাস্টমাইজ করে কাজটা হয়তো করতে পারবে ফেসবুক। কিন্তু বিষয়টা তখন কতটা আগ্রহ তৈরি করতে পারবে মানুষের মধ্যে, সেটা একটা বড় প্রশ্ন। ফেসবুকের মেটাবিশ্বে, মার্ক জাকারবার্গের মতে, তুমি বানাতে পারবে ঘরবাড়ি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ফার্নিচার ও নানা ধরনের জিনিস। মানুষ সেই ঘরবাড়িতে থাকবে, অর্থাৎ সেগুলো কিনে নেবে। এ ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হওয়ার জন্য শুধু ত্রিমাত্রিক অ্যাভাটার কাস্টমাইজ করে নেওয়াটা কতটা কাজে দেবে, তা চিন্তার বিষয়।
হলোগ্রাম হিসেবে তুমি কোনো কনসার্টে উপস্থিত হয়ে বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ করতে পারলে যে তৃপ্তি পাবে, তোমার কার্টুন অ্যাভাটার সেখানে গেলে, তুমি বিষয়টা সত্যিকার অর্থে উপভোগ করতে না পারলে কি সেই তৃপ্তি পাবে? হোক সেটা মোশন, মানে তোমার নড়াচড়া, অভিব্যক্তি অনুসারে বানানো অ্যাভাটার। তাতে কি খুব একটা লাভ হবে? ঠিক এখানে এসেই প্রশ্ন উঠছে মেটাবিশ্ব নিয়ে। মনে হচ্ছে, বিষয়টা বড় জোড় ত্রিমাত্রিক গেমের মতো হতে পারে, কিন্তু সামাজিক যোগাযোগের মূল উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারবে না। এটা ফেসবুকের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ।
আরেকটি মজার প্রশ্ন করেছেন অনেকে। মেটাবিশ্বের এই দুনিয়ায় তুমি যদি চব্বিশ ঘণ্টা থাকতে না পারো, যে সময়টা থাকবেন না, তোমার ত্রিমাত্রিক অ্যাভাটার বা হলোগ্রাম তখন কী করবে? ঘুমিয়ে থাকবে? নাকি অন্যদের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করবে নিজের মতো করে? শুনতে হাস্যকর হলেও, একটা বাস্তব ধরনের ভার্চ্যুয়াল পৃথিবী গড়ে তোলার জন্য এ রকম হাজারো চ্যালেঞ্জের সমাধান করতে হবে ফেসবুককে। ভার্চ্যুয়াল পৃথিবীতে তুমি যে বাড়িঘর কিনছ, যে কনসার্টে যাচ্ছ, যে খেলাটা টিকেট কেটে দেখছ, সেগুলো কি একই সঙ্গে ঘটবে বাস্তব পৃথিবীতেও? এর কোনো প্রভাব কি দেখা যাবে বাস্তব জগতে? ওপরে একটি মেয়ের কনসার্টে অংশগ্রহণের যে দৃশ্যটার কথা বললাম, তাতে কিন্তু ফেসবুক তেমনটাই বুঝিয়েছে। বিষয়টা কতটা অবাস্তব বা কল্পবিজ্ঞানের মতো শোনায়, তা তো বুঝতেই পারছেন। কিন্তু কল্পবিজ্ঞানের মতো শোনাচ্ছে, সে জন্য এটাকে মোটেও হেসে উড়িয়ে দিচ্ছেন না প্রযুক্তিবিদরা। তাঁদের প্রশ্ন হলো, এই কল্পবিজ্ঞানকে বাস্তব কীভাবে করবে ফেসবুক? ভার্চ্যুয়াল মেটাবিশ্ব এবং বাস্তব পৃথিবীর সামাজিক বিভিন্ন ঘটনাকে কীভাবে বাঁধবে এক সুতায়? একটা কনসার্টে কি এক হাজার বাস্তব টিিকটের পাশাপাশি হাজার দশেক ভার্চ্যুয়াল টিিকট বিক্রি করবে? তুমি কি বাংলাদেশে বসে মেটাবিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের একটা বাড়ি কিনে নেওয়ার মাধ্যমে বাস্তবেই ওই বাড়িটার মালিক হয়ে যাবে?
হাজারো প্রশ্ন। ফেসবুক, অর্থাৎ মেটার পরিকল্পনা ও প্রকাশিত ডেমো ভিডিওগুলো উত্তরের চেয়ে এ রকম প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে বেশি। ভিআর এবং এআর হেডসেটগুলো যদি সবার কেনার মতো অনেক সস্তা হয়ে যায় (যা বর্তমান বাজার অনুসারে মনে হচ্ছে, দিিল্ল বহু দূর!) এবং ফেসবুক যদি বাস্তব পৃথিবীর সঙ্গে ভার্চ্যুয়াল মেটাবিশ্বের সত্যিকার একটা যোগাযোগ আসলেই তৈরি করতে পারে, তাহলে হয়তো সম্ভব হতে পারে কল্পবিজ্ঞানের মতো এই ভার্চ্যুয়াল পৃথিবী। তাহলেও বর্তমান প্রযুক্তি থেকে ও পর্যন্ত পৌঁছাতে বেশ খানিকটা সময় লাগবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে মিক্সড রিয়েলিটি বলে একধরনের প্রযুক্তির অস্তিত্ব আছে বর্তমানেই। কাজটা করেছে মাইক্রোসফট। ‘মাইক্রোসফট হলোলেন্স ২’ নামের একটি হেডসেটের মাধ্যমে এই মিশ্র বাস্তবতায় বিচরণ করা যায়। এটি কিন্তু মার্ক জাকারবার্গের বলা পুরোপুরি ভার্চ্যুয়াল পৃথিবীর মতো না। অগমেন্টেড রিয়েলিটির মতো, আয়রনম্যান চলচ্চিত্রে যেমনটা দেখা যায়। হলোগ্রাফিক ফোনকলের মাধ্যমে, তোমার পরা হেডসেটের মাধ্যমে ও-প্রান্তের মানুষটি দেখতে পাবে তোমার এই পাশের সবকিছু। সে তা নিয়ে কাজও করতে পারবে। কিন্তু এতে তার বা তোমার কোনো হলোগ্রাফিক প্রতিরূপ দেখা যাবে না। হলোগ্রাফিক প্রতিরূপ দেখা যাবে যে জড় বস্তু নিয়ে কাজ করছে, সেটার। তবে হলোগ্রাফিক স্ক্রিনটা, যেখানে হলোগ্রাম দেখা যাচ্ছে, তা তুমি ডানে-বাঁয়ে নাড়াতে পারবে। এ টুকু হলোলেন্স করে তোমার মোশন ট্র্যাক করে। এজন্য এটি ব্যবহার করে দৃশ্যমান আলো ধরতে পারে, এ রকম চারটি ক্যামেরা; দুটি অবলাল আলো ধরতে পারে, এমন ক্যামেরা এবং অ্যাক্সিলারোমিটার, জাইরোস্কোপসহ আরও বেশ কিছু সেন্সর। তবে ফেসবুক, তথা মেটা যে মেটাবিশ্বের কথা বলেছে, তা এ রকম মিশ্র বাস্তবতা নয়, বরং পুরোপুরি ভার্চ্যুয়াল এক মেটাবিশ্ব হবে। আগেই বলেছি, সেটা আসলে কতটা সম্ভব, তা এখনো বোঝার কোনো উপায় নেই।
বর্তমানে এনএফটির মতো বিষয়গুলো বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। চড়া দামে ডিজিটাল আর্ট কিনছে মানুষ। বিনিয়োগ করছে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে। গেমিং ইন্ডাস্ট্রিতে লেনদেন হচ্ছে ট্রিলিয়ন ডলারের। অর্থাৎ ভার্চ্যুয়াল দুনিয়া নিয়ে ভালোই আগ্রহ আছে মানুষের। ফেসবুক, মানে মেটা যদি সত্যিকার ভার্চ্যুয়াল পৃথিবী তৈরি করতে না-ও পারে, হয়তো-বা তারা বানাতে পারবে বিভিন্ন গেমসহ ডিজিটাল নানা কর্মকাণ্ডের এক জগৎ। হয়তো মানুষ প্রচুর সময় ও অর্থ ব্যয় করবে এর পেছনে, অংশ হতে চাইবে সেই ভার্চ্যুয়াল দুনিয়ার। এখন যেমন অনেকেই ফেসবুকে কাটিয়ে দেন প্রায় সারা দিন! তবে এসব নৈতিক বা দার্শনিক আলোচনা এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। যদিও এ নিয়ে ভাবা প্রয়োজন সবারই। এ লেখার মূল কথা যদি সহজ করে বলতে হয়, তাহলে শিরোনামের দিকে তাকাতে বলব তোমাকে।
মেটাবিশ্ব আমাদের হাতছানি দিচ্ছে ভবিষ্যতের পৃথিবী থেকে, পৃথিবীর অসংখ্য প্রতিভাবান মানুষের মস্তিষ্ক থেকে। কিন্তু বাস্তবে এর দেখা পেতে আমাদের আরও অনেকটা অপেক্ষা করতে হবে। কল্পনা বলে উড়িয়ে না দিলেও একে বাস্তব বলে কাছে টেনে নেওয়ার সময় এখনো আসেনি।
শেষের আগে
আসল কথাটাই তো বলা হয়নি! না, ফেসবুক নামের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমটি মোটেও নাম বদলায়নি। ফেসবুক নামের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমটি ‘ফেসবুক ইনকরপোরেটেড’ নামের একটি প্যারেন্ট কোম্পানির অধীনে ছিল। সেই একই কোম্পানির অধীনে আছে হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম, অকুলাসসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান। প্যারেন্ট সেই কোম্পানির নাম বদলে রাখা হয়েছে ‘মেটা প্ল্যাটফর্মস ইনকরপোরেটেড’। নাম বদলের বিষয়টি মূলত আইনি কিছু সুবিধার জন্য করা হয়েছে। তবে ফেসবুকের ভাষ্যমতে, ‘মেটাভার্স’ নামের ভার্চ্যুয়াল এক পৃথিবী গড়ে তোলাকে মূল লক্ষ্য বলে ঠিক করেছে তারা, সে জন্যই প্যারেন্ট কোম্পানিটির এই নতুন নাম। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক আছে আগের মতোই। এর নাম-পরিচয় বা নীল-সাদার দুনিয়ার কোনো পরিবর্তন আসছে না।
You must be logged in to post a comment.