আলো চারদিক ঘিরে। অমবস্যার অন্ধকার মুখ নিয়ে টেন্ডা বাভুমাকে সেটি ছুঁতে পারছিল কই? বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজ হারের পর প্রশ্ন যে কয়টি হলো, তাতে একটা উত্তর মনে দাগ কেটেছে।
' আসলে কিভাবে সিরিজটা হারলাম এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছি আমিও। মাস কয়েক আগে যখন ভারতকে হোয়াইট ওয়াশ করলাম, তখন আমাদের দলটা মনোবলের দিকে অনেক শক্ত অবস্থায় ছিল। ভারতকে হারানোর জন্য যে তেজী মনোভাব ছিল, সেটি এ সিরিজে অনুপস্থিত। কিভাবে কি হলো তা বুঝতে পারছি না এখনো।'
বাভুমা আছেন অনেক যন্ত্রণায়। মার্করামকে প্রথম ওয়ানডের পর একাদশের বাইরে রাখায় ডেইল স্টেইনদের মত সাবেক প্রোটিয়াদের তোপের মুখে ছিলেন সারাক্ষণ। এই সিরিজ শুরুর আগেও জোর গলায় বলেছিলেন, বাংলাদেশ ভাল দল হলেও-ভারতের বিপক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকার ছন্দটা দলের মধ্যে বিদ্যমান। সব হাওয়ায় উড়ে যাওয়ার পর, তাদের ক্রিকেট ইতিহাসে অন্যতম বড় বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়ানো ওয়ানডে অধিনায়কের মুখটা ম্লান থাকারই কথা।
সে তুলনায় উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়েছে বাংলাদেশের সবার মুখ। দেশের বাইরে যে বাংলাদেশ হেসে-খেলে জিতে আসছে সেটা তো না! দেশের বাইরে সিরিজ জয়ের চক্রটা এতোদিন এমন ছিল তামিমদের জন্য;
জিম্বাবুয়ে-ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ওয়েস্ট ইন্ডিজ-জিম্বাবুয়ে এবং আবারো জিম্বাবুয়ে-ওয়েস্ট ইন্ডিজ! এর আগে প্রথমটি কেনিয়ায়। প্রোটিয়াদের মাটিতে জয়, গত চার বছরে তৃতীয় বিদেশের মাটিতে সিরিজ জয়। এটি মহা ব্যতিক্রম। এর সোজা হিসেবে দাঁড়াচ্ছে, একটা চলমান প্রক্রিযার মধ্য দিয়ে এসেছে এই অর্জন। খুব বিচ্ছিন্ন বলে অন্তত: ওয়ানডেতে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই।
একইভাবে তাসকিনের ফিরে আসাটাকে বিচ্ছিন্ন বলা সম্ভব নয়। দেশের অন্যতম সেরা ফাস্ট বোলার যার বলে ফিল্ডাররা ক্যাচগুলো ধরলে হয়তো, উইকেট সংখ্যায় আরো ২০টি যোগ হতো তার এতোদিনে। এই জয়ের পর তাসকিনের বছর দুয়েক ধরে নিজের সঙ্গে যুদ্ধগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমার খুঁড়ে বের করেছে। প্রশংসা ও স্তুতিতে তাকে ডুবিয়ে বা ভাসিয়ে নেয়ার চেষ্টা।
তাসকিন কোন বসিলার দূর এক নির্জন প্রান্তরে কোভিড সময়ে দৌড়ঝাঁপ করে নিজেকে ফিট রেখেছেন, সেটি এখন আলোচনায় আসবে স্বাভাবিক। যখন নিয়মিত স্কুল বন্ধ থেকে অনলাইন ক্লাস হয়েছে শিক্ষার্থীদের। ক্রিকেটারদের তো আর অনলাইনে নিজেকে ফিট রাখার উপায় নেই। তাই এটি বাড়তি নিবেদন বলা চলে। তাসকিন কতটা বদলেছেন সেটা ২০১৭ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজ আর পাঁচ বছর বাদের সিরিজ পাশাপাশি রাখলেই চলে। মাঝে দ্বিতীয় ওয়ানডেতে বেদম মার খাওয়ার পর, তৃতীয় ম্যাচে বাড়তি বাউন্সে প্রতিপক্ষকে ডুবিয়ে দেয়া-এই অনমনীয় ভাবটাই বড় পাওয়া। অথচ সামাজিক মাধ্যমে তাঁকে নিয়ে কি হাস্যরস তৈরী হয়েছিল সে সময় সেটি তাসকিনের ভুলে যাওয়ার কথা নয়।
এই সিরিজ জয় একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে। এই যে সিনিয়র চার ক্রিকেটারকে অনেক সময় সদর দরজা দিয়ে চলে যেতে বলা হয়, তাদের নিজেদেরও আঁতে ঘা লাগার কথা। একটা ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট অংশ থেকে বলা হয়েছিল, সিনিয়রদের খুব প্রয়োজন বাংলাদেশে এখন নেই। কারণ বড় কোন টুর্নামেন্ট তারা জেতেনি। সামনের দিনে যে জিতবে সেটাও মনে হচ্ছে না। কিন্তু ব্যাটন দিতে গেলে তো অনেকটা দৌড় তাদেরও দিতে হয়! সেই ব্যাটনটা এখন লিটন-আফিফ-মিরাজদের হাতে চলে যাচ্ছে। পরের দৌড়টা তারাই শুরু করবেন। সেটি আবার হাত বদল হয়ে চলে যাবে আকবর-জয়দের হাতে। পালা বদল রাতারাতি হয়না।
তিন কোটি বোনাস দেয়াটা ভাল হয়েছে বিসিবি'র তরফ থেকে। আরো ভাল হবে জালাল ইউনুসরা একটি পেস বোলিং ফ্যাসিলিটি তৈরী করলে। এইচপি, টাইগার্স যাই করা হোক না কেন, আলাদা পেস ক্লিনিকের ব্যবস্থা না করলে কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কম। দিন শেষে তো ম্যাচ জেতায় বোলাররা দেশের বাইরে। প্রোটিয়াদের হারানোর পর কি এ কথায় কারো আপত্তি আছে? নাহলে কবে একজন তাসকিন বা মুস্তাফিজ ফিনিক্স পাখির মত ভস্মাধার থেকে পুর্নজন্ম নিয়ে এমন জয় এনে দেবেন, সেই অপেক্ষা কখনো ফুরাবে না। ব্যাটন তো শুধু ক্রিকেটারদের হাত ধরে বদলানোর জন্য নয়। বোর্ডেরও কাজ ব্যাটনটা ঠিকঠাক বদলের জায়গাটা তৈরী করে দেয়া।
You must be logged in to post a comment.