Top: পোশাকের বর্জ্য থেকে সুতা তৈরি করে সিমকো

জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে পোশাকের মূল কাঁচামাল সুতা উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব পড়ছে পৃথিবীতে। বাড়ছে পোশাকের বর্জ্য, অপচয় হচ্ছে পানি, বিষাক্ত রাসায়নিকে নষ্ট হচ্ছে মাটি, বাড়ছে কার্বন নিঃসরণও। বিনষ্ট হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। দূষিত হচ্ছে পরিবেশও।

এত কিছুর পরও এখন পর্যন্ত সারা বিশ্বে পোশাকবর্জ্যের মাত্র ১২ শতাংশ পুনর্ব্যবহার বা রিসাইকেল হয়। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য পোশাকবর্জ্যের পুনর্ব্যবহার নিয়ে চলছে পৃথিবীজুড়ে নানা গবেষণা। বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোও ঝুঁকতে শুরু করেছে পুনঃ উৎপাদিত পণ্যে। বাংলাদেশেও পোশাকবর্জ্যের পুনর্ব্যবহার শুরু হয়েছে। একাধিক প্রতিষ্ঠান এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। তেমনি একটি প্রতিষ্ঠান সিমকো স্পিনিং অ্যান্ড টেক্সটাইল। সাইক্লো ফাইবার নামে তাদের একটি সুতার ব্র্যান্ডও রয়েছে।

সাইক্লো ফাইবারের সুতা পুরোনো পোশাক বা ঝুট কাপড় দিয়ে উৎপাদন করে সিমকো। ২০১০ সালে সিমকো গ্রুপ যখন এই প্রকল্পে হাত দেয়, তখনো বিষয়টি এতটা জোরেশোরে আলোচনায় আসেনি। ফলে অনেকেই তখন বেশ অবাক হয়েছিলেন। কেউ কেউ এ উদ্যোগের ভবিষ্যৎ নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেন।

এমনটাই জানালেন সিমকো স্পিনিং অ্যান্ড টেক্সটাইলের পরিচালক মুস্তাফাইন মুনীর। তিনি বলেন, এক দশক আগে আমার বাবা খাজা মুনীর মাশুকুল্লাহ এই উদ্যোগ নেন। সে সময় একটি স্প্যানিশ প্রতিষ্ঠানের টি-শার্টের ঝুট থেকে সুতা তৈরির বিষয়টি জানার পর বাবা ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা অনুধাবন করতে পারেন। তখন বাবা ভাবলেন, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রচুর টি-শার্ট তৈরি হয়। সেই টি-শার্টের ঝুট থেকে পুনঃ উৎপাদনের মাধ্যমে সহজেই মানসম্পন্ন সুতা উৎপাদন করা সম্ভব। এভাবেই শুরু। আসলে সম্ভাবনার পাশাপাশি অব্যবহৃত কাঁচামাল ব্যবহারে মূল্য সুবিধার বিষয়টি বাবাকে উদ্যোগী করে তোলে।

বাবার কাছ থেকে শুনে এই উদ্যোগের প্রতি আগ্রহী হন যুক্তরাষ্ট্রে বেড়ে ওঠা মুস্তাফাইন মুনীর। যুক্তরাষ্ট্রে তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানের পাশাপাশি সংগীত ও সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের ওপর পড়াশোনা করেন। পড়ালেখা শেষে ২০১১ সালে দেশে ফিরে হাল ধরেন এই প্রকল্পে। তার হাত ধরেই এখন এগিয়ে চলছে সিমকোর পুনঃ উৎপাদন ব্যবসা।

সিমকো সুতা তৈরির জন্য সাধারণত পোশাক কারখানা থেকে সংগ্রহ করা ঝুট কাপড় ব্যবহার করে। এ ছাড়া কোনো ব্র্যান্ডের বাতিল হওয়া নতুন পোশাকও ব্যবহার করা হয়। তবে সুতার শক্তি বাড়াতে অনেক ক্ষেত্রে নতুন তন্তু বিশেষ করে তুলা (ভার্জিন কটন) যুক্ত করা হয়। শক্তির তারতম্য অনুযায়ী ঝুটের সঙ্গে ২০ থেকে ৫০ শতাংশ অন্য তন্তু মেশানো হয়ে থাকে।

ঝুট কিংবা পুরোনো কাপড় দিয়ে সুতা তৈরি করতে কোনো রাসায়নিক পদার্থ মেশানোর বা রং করার প্রয়োজন হয় না। তাতে পানির সাশ্রয় হয়। কার্বন ডাই–অক্সাইড নিঃসরণও কমানো যায়। তবে বাংলাদেশে উৎপাদিত ঝুটের মাত্র ২০ শতাংশ দেশে পুনর্ব্যবহার হচ্ছে। বাকি ৮০ শতাংশ রপ্তানি হচ্ছে ভারত ও চীনে। এমন তথ্য দিয়ে মুস্তাফাইন মুনীর জানান, দেশীয় বাজারে সিন্ডিকেটের কারণে এই ঝুট পাওয়া বেশ কষ্টসাধ্য। যদিও বর্তমানে বিভিন্ন ব্র্যান্ডই তাদের নির্ধারিত তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশনা দেওয়ায় ঝুট পাওয়া কিছুটা সহজ হয়েছে।

নিট ও ওভেন—উভয় ধরনের পোশাকের জন্যই সুতা তৈরি করে থাকে সাইক্লো। তবে এই সুতায় মাঝেমধ্যে রঙের তারতম্য ঘটে থাকে। যদিও সেটা খুব একটা যে চোখে পড়ার মতো, তা-ও নয়। সাইক্লো ফাইবার ৬ সিঙ্গেল থেকে ৩০ সিঙ্গেল পর্যন্ত বিভিন্ন কাউন্টের হয়ে থাকে। পুনঃ উৎপাদিত সুতার দাম সাধারণ সুতার চেয়ে ১৫-২০ শতাংশ কম বলে জানান মুস্তাফাইন মুনীর।

সাইক্লোর তৈরি সুতা দিয়ে টি-শার্ট, পোলো শার্ট, সোয়েটার, ডেনিম কাপড়, শার্ট, জিনস ইত্যাদি ছাড়াও গ্লাভস, মোজা, কমফোর্টার, হোম টেক্সটাইল, ব্যাগসহ নানা ধরনের অনুষঙ্গও তৈরি হচ্ছে। প্রতিটি পণ্যের ধরন অনুযায়ী তৈরি হয় সুতা। বর্তমানে সিমকো স্পিনিং অ্যান্ড টেক্সটাইল এইচঅ্যান্ডএম, জারা, প্রাইমার্ক, বারশকা, বেস্টসেলার, লিডল, কিয়াভি, কোহল’স, ওয়ালমার্ট, কিক, হেমা, রেনার, অ্যাডিডাস, নাইকি, টার্গেট, ইন্ডিটেক্সসহ অন্তত ৪০টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সুতা নিয়ে থাকে এইচঅ্যান্ডএম। প্রতিষ্ঠানটি প্রতি মৌসুমেই ১৫ লাখ কেজি সুতা কিনে থাকে।

সিমকো স্পিনিং অ্যান্ড টেক্সটাইলের পরিবেশবান্ধব সুতা তৈরির এ যাত্রা শুরু হয় ২০১১ সালে। মুস্তাফাইন মুনীর জানান, ২০১৫ থেকে ২০২১—এই ছয় বছরে পোশাকবর্জ্য ব্যবহার করে ১০ হাজার টনের বেশি সুতা উৎপাদিত হয়েছে ঝুট ব্যবহার করে। এতে সাশ্রয় হয়েছে ৭৫ হাজার টন কার্বন ডাই-অক্সাইড, ২০৬ কোটি লিটার পানি এবং ৭১ হাজার টন ক্ষতিকারক বিষাক্ত বর্জ্য।

ময়মনসিংহের ভালুকার কারখানায় বর্তমানে প্রতিদিন ১৩ টন সুতা তৈরি করছে সিমকো। ২৫০ কর্মী নিয়ে শুরু করা এই প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে কাজ করছেন ৭০০ কর্মী। গত দুই বছরে তাঁদের উৎপাদন সক্ষমতা বেড়েছে ৬০ শতাংশ। মুস্তাফাইন মুনীর জানান, ২০১১-১২ অর্থবছরে তাঁদের উৎপাদন ছিল ২ হাজার ৪০০ টন সুতা, যার আর্থিক মূল্য ছিল ৩৬ লাখ মার্কিন ডলার। আর গত ২০২১-২২ অর্থবছরে এসে উৎপাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৪০০ টনে, যার অর্থমূল্য ১ কোটি ৩৫ লাখ ডলার।

সাইক্লো ব্র্যান্ডের যে সুতা তৈরি হচ্ছে, তা সবই নতুন বর্জ্য থেকে। তবে পুরোনো বর্জ্য ব্যবহার করে সুতা উৎপাদনের সমূহ সম্ভাবনাও রয়েছে। কিন্তু উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কাঁচামাল (পুরোনো পোশাক) পাওয়া না যাওয়ায় সেটা এখনো সম্ভব হচ্ছে না। বাংলাদেশের ক্রেতারা পুরোনো সুতায় তৈরি পোশাকের প্রতি ততটা আগ্রহী নয়। তা সত্ত্বেও পোশাকের দেশীয় ব্র্যান্ড ঢাকা রিপাবলিক, পারা, খেলো বিডি, মোটিফ এবং হ্যান্ডটাচ সাইক্লো ফাইবার ব্যবহার করে থাকে।

Enjoyed this article? Stay informed by joining our newsletter!

Comments

You must be logged in to post a comment.