বন্ধুর কাজিনের মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে গেলাম কিংস্টন শহরে। শহরটা টরন্টো আর অটোয়ার মাঝামাঝিতে। যেতে অবশ্য চাইনি, বন্ধু মূলা ঝুলিয়ে এনেছে। বলেছিল আমাকে গিফট কিনতে হবে না, সে কিনে ফেলেছে। তার অফিস থেকে পাওয়া esso গ্যাস ফুয়েলের পঞ্চাশ ডলারের গিফট কার্ড আমাকে দিতে চায়। ওটা নাকি অনেকদিন ধরে তার ড্রয়ারে পড়ে নষ্ট হচ্ছিল।
.
না করতে পারিনি।
তবে এবার আমি খুব হুশিয়ার; আমাকে দিয়ে যেন কোনো কাজ করিয়ে নিতে না পারে। যাবো আর দাওয়াত খেয়ে চলে আসবো। আমাকে ডাকার পেছনে তার একটা উদ্দেশ্য থাকবেই। গতবার টরন্টোতে দাওয়াতে নিয়ে গিয়ে ক্যামেরা হাতে ধরিয়ে বলল, তোর কাজ ছবি তোলা। তাড়াহুড়া করে খেতে বসা ভদ্রলোকের কাজ না। অনুষ্ঠানের সবচাইতে ইম্পরট্যান্ট ছবি হলো খাওয়ার ছবি। লোকজনরে বলবি রোস্টের রান হাতে ধরে রাখতে, সেই অবস্থায় হাসতে।
.
আমি কাজে লেগে গিয়েছিলাম। মানুষ যখনই মুখে পুরার জন্য নলা তুলে হা করছিল, ঠিক ঐ মুহূর্তে ক্যামেরার শাটার ফেলতে থাকি। খালাম্মারা যখন মাংস থেকে চর্বি দাঁত দিয়ে টেনে ছিড়বার আপ্রাণ চেষ্টায় মারামারি করছিল, সেই মুহূর্তের ছবি! কি ডায়নামিক! কিন্তু বেশিক্ষন পারিনি। চারিদিকে ছাগলের বিরিয়ানির গন্ধে আমার প্রাণ ওষ্ঠাগত। তীব্র খিদে পেটে নিয়ে ভক্ষণ চিত্র ধারণ করা সুখকর কিছু না। এবার ঠিক করেছি তার কাছ থেকে পালিয়ে নিজের মতো করে খাবো। তার সামনে বসে খাওয়া আর হেড স্যারের নজরদারিতে ঐকিক অঙ্ক কষা একই কথা। মানুষ সুখের স্মৃতি ভুলে যায়, কষ্টের স্মৃতি মনে রাখে।
.
অনুষ্ঠান সন্ধ্যা ছয়টায়। আমরা দুপুরে লাঞ্চ করার জন্য টিম হর্টন্স কফিশপে ঢুকে আড়ালে কর্নারের টেবিলে বসলাম। চিশতী আমার পায়ের কাছে রাখা ব্যাগটা দেখিয়ে বলল, ভিতরে কী?
- কিছু না
- এই কিছুনাটা কী শুনি? খাবার?
- হু
- লুকানোর কী আছে? আমিও তো এখন লাঞ্চ করবো।
.
আমি চটের ব্যাগটা খুলে বাংলাদেশ থেকে আনা বড় সাইজের চারতলা টিফিন ক্যারিয়ারটা টেবিলে রাখতেই সে বলল, কয় বেলার খাবার?
- শুধু দুপুরের, রাতেরটা আছে
- রাতে না দাওয়াত?
- দাওয়াত তো সন্ধ্যায়?
- লা হাওলা ওয়ালা কুয়াতা.. তুই তো মরবি? এখন বাজে বিকাল তিনটা। দুইটার দিকে এখানে পৌঁছে ক্রিম চিজ বেগল, মাফিন আর ব্রকোলি স্যুপ খাইলি
- ঐগুলা তো নাস্তা। দুপুরের খাওয়া আলাদা।
.
টিফিন ক্যারিয়ারের একদম উপরের (৪র্থ) তলা থেকে সীম ভাজি আর বতকের ডিম ভুনার বাটিটা নামালাম। তৃতীয় তলা থেকে খসালাম গরুর কলিজা ভুনা। দ্বিতীয় তলা থেকে পাতলা মসুরের ডাল আর শেষের তলায় পড়ে থাকলো মোটা ইরি ধানের ভাত।
.
সে চতুর্থ তলার বাটিটা নিজের দিকে টেনে পরখ করে নিয়ে আবার ফিরিয়ে দিয়ে তৃতীয় তলার বাটি নাকের কাছে এনে বলল, কি রে এগুলা?
- গরু কলিজা ভুনা। একটা খা?
- এখানে কমপক্ষে এক পোয়া কলিজা। তোর ব্লাড সুগার আর কোলস্টেরল টেস্ট করিস। এই হাফ কেজি চালের সব ভাত খাবি?
সে অনিচ্ছা দেখিয়ে 'দে দেখি' বলে এক পিস তুলে মুখে পুড়ে বলল, ভাবীর হাতের রান্না ভালো।
আমি কোথাও খাবার নিয়ে গেলে তাকে সাধি না। প্রথম প্রথম সাধতে গিয়ে গালি খেতাম। সে দুপুরে খাবে স্পেশাল খাবার। খুব স্ট্রিক্ট। সে লাঞ্চ বক্স বের করলো। চমৎকার স্বচ্ছ প্লাস্টিকের ঢাকনা দেওয়া বাটি। ভেতরে গ্রেপ টমেটো, এক গাদা রোমাইন লেটুস, কচি পালং পাতা, বিভিন্ন প্রকারের বাদাম, মিষ্টি কুমড়ার বিচি, চিকেন ব্রেস্ট কুচি, লেবুর রস আর অলিভ অয়েল দিয়ে মাখানো। উপরে ছাগলের চিজের সাদা ধবধবে গুঁড়া ছিটানো।
.
আমার মাথায়ই ঢুকে না, মানুষ এসব ক্যামনে খায়? অথচ কাঁটা চামচ দিয়ে তুলে লেটুসগুলো খচমচ শব্দে আয়েশ করে এমনভাবে চিবাচ্ছে; মনে হচ্ছে এরকম স্বাদের জিনিস ইহজগতে আর নাই। যেন কলাবাগানের মামা হালিম খাচ্ছে।
আমি ব্যাগ থেকে মাটির থালা বের করতেই সে চোখ কপালে তুলে বলল, এই থাল কোথায় পাইছিস?
- অটোয়ার বাঙালি দোকানে। ডাল উপচায়ে পড়ে না
- ভালো।
কিছুক্ষন পর টিম হর্টন্স এর এক কর্মী এসে আমাকে একটু লবন আর কিছু সালাদ দিয়ে গেলো। সে জিজ্ঞেস করল, কিনলি এইগুলা?
- না, এমনি দিলো। পরিচিত তো..
- বাঙালি?
- হু
- তোর কোনখানে পরিচিত বাঙালি নাই বলতো? অদ্ভুত চিড়িয়া!
.
.
ভাতে লবন ছিটিয়ে, আধা বাটি ডাল ঢেলে, ডিম ভুনা আর সিম ভাজি দিয়ে বিসমিল্লাহ করলাম। হাপুস হুপুস শব্দ তুলে, কচ কচ করে কাঁচামরিচ আর পিঁয়াজে কামড় বসাতে থাকি।
সে খাবার শেষ করে ছোট চায়ের ফ্লাস্ক বের করে গ্রিন টি বানালো। চিনি ছাড়া। তারপর চেয়ারটা পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রী ঘুরিয়ে বাইরে তাকিয়ে চায়ে আলতো করে চুমুক মেরে গভীর চিন্তায় ডুবে গেলো। হঠাৎ বলে উঠল, রিপন
- বল
- তুই খুব সুখী। তোর খাওয়া দেখলে আমারও ইচ্ছা হয়। পারি না। ডাক্তারের এক গাদা নিষেধ।
.
এবার আমি কলিজা ভুনা ঢেলে নেই। অতিরিক্ত পেঁয়াজ দেবার কারণে মিষ্টি মিষ্টি লাগছে। পাতলা ডালের সাথে সুপার কম্বিনেশন। কলিজার সাথে হৃদপিণ্ডের একটা বড় খণ্ডও আছে; সেটার চূড়ায় মেঘের মতো চর্বি লেপ্টে দেওয়া! সে জানতে চাইলো, কলিজা রান্নার প্রসেস কী রে?
- টুকরাগুলা পাঁচ মিনিট গরম পানিতে ফুটায়ে নিয়ে পানি ফেলে তারপর ভুনা করতে হয়
- বলিস কি!
- হু। বেশি করে গরম মশলা, আদা-রসুন বাটা, আস্ত গোলমরিচ দিয়ে অল্প পানিতে কষাতে হয়
- দেখি ট্রাই করবো।
.
আমি বাটির ভাত শেষ করে চটের ব্যাগ থেকে ছোট প্লাস্টিক বক্সে আনা এক্সট্রা ভাতটুকু ঢেলে বাকি ডাল আর তরকারি মুছে নিয়ে আখেরী চুমুক দিতে থাকি। সে শুধু বিস্ময়ে চেয়ে দেখলো, কিছু বলল না। গিন্নি অবশ্য খাবারগুলো আমাদের দুজনের জন্যই দিয়েছিল। ও না খেলে আমার আর কি..
.
আমরা অন্টারিও লেকের ধারে ঘোরাঘুরি করে সাড়ে পাঁচটার দিকে অনুষ্ঠানে ঢুকলাম। এলাহী কারবার। এবার আমি খুব সতর্ক। গতবার এক কবি ধরিয়ে দিয়ে সে পালিয়েছিল। ভদ্রলোক আমাকে সহজসরল পেয়ে তার কবিতা বইয়ের অর্ধেকটা শুনিয়েই ছাড়লো। আমি গদ্য কবিতার 'গ'ও বুঝি না। "পিতলের কলসের বুকে নক্ষত্রের চিৎকার.. হংসমিথুনের পাখনায় শিশিরের প্রেতাত্মা" জাতীয় দুর্বোধ্য লাইনগুলোর অর্থ উদ্ধার করবার ক্ষমতা সৃষ্টিকর্তা আমাকে দেননি। নিজেকে বোকা মনে হয়। বইটার বাকি অর্ধেক না শুনানোর কারণ বুঝেছিলাম ছয় মাস পর। মহা মূল্যবান কবিতা যদি জেনেই ফেলি, পয়সা খরচ করবো কেন? পকেট থেকে পঁচিশ ডলার খসলো।
.
আজও চিশতী আমাকে বরাবরের মতো আড়ালে নিয়ে গিয়ে বলল, শোন; মনে রাখবি তুই মেয়ে পক্ষের। বেশি ইয়ার্কি ফাজলামি করবি না
- ওকে
- বলতো কখন ইয়ার্কি করা যায়?
- যখন ছেলে পক্ষের হবো
- সাব্বাশ! কে বলে তোর বুদ্ধি নাই? পারলে একটা ব্লেজার কিনবি
- ওকে
- আমার কয়টা ব্লেজার আছে জানিস? অন্তত এক ডজন! একটা ব্লেজারের দাম কত আন্দাজ আছে?
- একশ দেড়শ ডলার?
- ধুর বোকা, সালভেশন আর্মি থেকে কিনবি। আট থেকে বারো ডলার। দেখে কেউ বুঝবে যে এগুলা পুরানা? তোর টি শার্টের থেকেও দাম কম
- বিয়ের স্যুটটা অবশ্য এখনো আছে, একটু টাইট হয়
- হাভাতের মতো খাবি না। আর এদেশের মানুষের সাথে হ্যান্ডশেক করে হাত বুকে ঠেকিয়ে হাসার দরকার নাই
- ওকে।
.
আমরা দাওয়াত খেয়ে রাত আটটার দিকে আগে আগে বের হয়ে আসি। কয়েকশ কিলোমিটার যেতে হবে। তাছাড়া কাল সকালে অফিস ধরতে হবে। সে বলল, রিপন তোর কি ডিশ ওয়াসার লাগবে? এক ভদ্রলোক ফ্রি দিচ্ছে, কিজিজিতে দেখলাম
- লাগবে দোস্ত
- গুড চল নিয়ে আসি। লোকটা ভ্যাঙ্কুভার চলে যাচ্ছে তল্পিতল্পাসহ। মাত্র তিন বছর আগের। দশ বছরের ওয়ারেন্টিও কিনেছিল। কি লাকি তুই!
আমরা কিংস্টন শহরে একটা বাড়ির সামনে থামি। সেখানে সত্যি সত্যি একটা জেনারেল কোম্পানির ডিশ ওয়াসার রাখা গ্যারেজের কাছে। আমরা দুজন ধরাধরি করে আমার গাড়ির পেছনে এনে তুললাম। সে বলল, রিপন একটা হেল্প করতে পারবি?
- শিওর!
- একটু আয় তো?
আমরা গ্যারেজ খুলে ভেতর থেকে বিশাল সাইজের একটা লন্ড্রি ওয়াশার বের করে বাইরে এনে হাঁপিয়ে উঠি। চিশতী ভালোমত দেখে বলল, জিনিসটা ভালো! কমপক্ষে হাজার ডলার দাম। প্রায় নতুন। কত নিলো বল তো?
- দুইশ?
- কাছাকাছি। আড়াইশো। ড্রায়ারটার কী অবস্থা দেখি।
.
আমরা ড্রায়ারটা এনে তার গাড়ির কাছে রাখলাম। প্রচন্ড ভারী আর বড়। এমনিতেই বাসা চেঞ্জ করতে গিয়ে আমার গা ব্যাথা। তার ওপর আজ এসব টানাটানি করতে গিয়ে ব্যাথা তুঙ্গে উঠলো। সে বলল, রিপন বিপদে পড়লাম
- কী বল?
- ড্রায়ারটা আমার গাড়িতে আঁটবে না। তোর গাড়িতে জায়গা হবে?
আমার গাড়ির সিট নামিয়ে বেশ কিছু জায়গা ফাঁকা করে ওটা ঢুকালাম। তবুও খানিকটা বের হয়ে থাকলো। সে দড়ি বের করে ভালো করে বাঁধলো। আমরা ছুটলাম টরন্টোর দিকে। আমার বাড়ির উল্টো পথে।
.
গিন্নির ফোন রাত দশটার দিকে, রওনা দিছো?
- একটু লেট হবে
- কেন?
- একটু টরন্টোর দিকে যাচ্ছি..
- কেন?
- চিশতির একটা জিনিস পৌঁছায় দিতে..
- সারাদিন ওই-ই করো! এরকমই সন্দেহ করছিলাম। সত্যি করে বলোতো তুমি অনুষ্ঠানে গেছো, না ভাই কে হেল্প করতে?- বলে লাইন কেটে দিলো।
.
তার বাসা দুইশ ষাট কিলোমিটার পশ্চিমে। তারপর সেখান থেকে রাতেই রওনা দিবো অটোয়ার দিকে; আরও সাড়ে চারশ কিলোমিটার পূবে; মোটমাট আট-নয় ঘন্টার পথ। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে গেলো। তবুও ভালো যে রাতের খাবার আনছিলাম !
তার বাসায় পৌঁছে ওগুলো ধরাধরি করে নামিয়ে দিয়ে আসলাম বেজমেন্টে। আমার পায়ের নখ উপড়িয়ে রক্তারক্তি। তাও যদি সাধের ডিশ ওয়াসারটা চলতো। বাসায় এনে অনেক চেষ্টায়ও অন করতে পারি নাই। ভাবছিলাম বাসন মাজার হাত থেকে রেহাই পাবো, গিন্নিও খুশি হবে।
.
esso গ্যাস ফুয়েল গিফট কার্ড পেয়েছিলাম পঞ্চাশ ডলারের, ফুয়েল খরচ হয়েছিল দেড়শো ডলার। সেটাও মেনে নেয়া যেত, যদি হাইওয়েতে সৃষ্টকর্তার নিজ হাতে ছুড়ে মারা খোয়ার আঘাতে গাড়ির উইনসিল্ড না ফাটতো..
.
.
জাভেদ ইকবাল
ফেব্রুয়ারী ২৮, ২০২২।
You must be logged in to post a comment.