Top: নীলাভ্র আর নীলাম্বরীর গল্প

জীবনের টানাপোড়েনে অনেক সময় অনেক কিছুই বদলে যায়। অবেলায় হারিয়ে যায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ চাওয়া পাওয়া। মানুষ বদলে হয়ে যায় কাঠের পুতুল,,,
সুস্থ মস্তিষ্ক হয়ে যায় বিকৃত। অর্থ সম্পদের কাছে পরাজিত হয় মানবিকতা, মনুষ্যত্ব। হারিয়ে যায় ভালোবাসা নামক একটি চিরচেনা অধ্যায়।
সকাল সকাল বাসায় ফিরে এসেই বিছানায় গা টা এলিয়ে দিলো অর্ণব। নাইট শিডিউল এ ডিউটি করাটা যদিও অনেক টাফ, তবে ও যেই কোম্পানিতে চাকরিটা করে সেখানে মাঝ রাতের পর ঘুমানোর ব্যবস্থা আছে। সিকিউরিটির চাকরিতে এর চেয়ে বেশি সুবিধা আর কিইবা হতে পারে। এক সপ্তাহে ডে করে তো অন্য সপ্তাহ নাইট। যেদিন নাইট ডিউটি থাকে সেদিন সারাদিন ধরেই একটা পুরোনো সাইকেলে করে ফুড ডেলিভারিতে লেগে যায়। এতে চলে যায় কোনোরকমে। আজো তার ব্যাতিক্রম হবেনা।
কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে উঠে বাথরুমে গিয়ে ভালো করে হাত মুখ ধুয়ে এসে খেয়ে নেয় সে। ব্যাচেলর মেসের প্রতিদিনকার সকালের রুটিন_ভাত, ডাল আর আলুভর্তা। খাওয়া শেষে ফুড ডেলিভারির ইউনিফর্ম টা গায়ে গিয়ে বিশাল ব্যাগটা কাধে নিয়ে বেরোবার মুহুর্তেই পকেটে থাকা ফোনটা জানান দেয়, কেউ তাকে স্বরণ করেছে। পকেট থেকে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখে বাড়ি থেকে মায়ের কল এসেছে। তারাতাড়ি কলটা কেটে দিয়ে নিজ তাগিদে কল করে সে।
মায়ের কন্ঠটা খুবই বিষণ্ণ লাগছে আজ। ব্যাতিব্যস্ত হয়ে বিষণ্ণতার কারণ জানতে চাইলে মা বলে- তোর আব্বার শরীরডা ভালা নাই। কয়ডা টাকা দিতে পারবি বাপ? মানুষটারে অষুধ খাওয়ানো লাগে। অর্ণব মলিন কন্ঠে বললো -কি হইছে আব্বার?
-পুরান রোগে ধরছে। সারাক্ষণ কাশি লাইগাই থাকে আর জ্বর তো আছেই। খাইতে পারেনা কিছুই। একটু পানি খাইলেও বমি কইরা ফালাইয়া দেয়। কি যে করমু বুঝতে পারতাছিনা। হাতে একটা টাকাও নাই।
-বিকেলে টাকা পাঠাবো। আব্বারে ওষুধ কিনে খাইয়ে দিও।
-আইচ্ছা। বলেই কলটা কেটে দিলো অর্ণবের মা। অর্ণব ধপাশ করে বসে পরলো খাটে। ওর বাবার এটা পুরোনো রোগ। কিছুদিন পরপরই রোগটা দেখা দেয়। টাকার জন্য ভালো কোনো ডক্টর দেখাতে পারেনা। ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে এনে খেয়ে রোগটা কিছুদিনের জন্য দমনে রাখে শুধু।
অর্ণব চিন্তায় পরলো। কি করবে সে, কোথা থেকে টাকা এনে বাড়ি পাঠাবে ভাবতে পারছেনা। পুরোনো ছেড়া মানিব্যাগটা হাতে নিয়ে দেখলো ওতে ৪০০ টাকা পরে আছে। এই টাকাটা সে ফুডের কাজের জন্য রেখেছে। যদিও এই টাকাটা ফুডের জন্য কিছুই না। অধিকাংশ অর্ডারই আসে বড় বাজেটের। এই নিম্ন বাজেটের অর্ডার খুব কমই আসে। এই টাকাটা পাঠিয়ে দিলে আগামী কয়েকদিন পার্ট টাইমের এই ফুড ডেলিভারির কাজটা সে আর করতে পারবেনা। কয়েক মুহূর্ত চিন্তা ভাবনা করার পর সে বেরিয়ে পরে কাজে। এতো চিন্তা করলে চলবেনা। কাজ করতে হবে। সারাদিন ফুড ডেলিভারি করে যে টাকাটা পাবে তার সাথে হাতে থাকা টাকাটা মিলিয়ে বাড়ি পাঠাতে হবে। পরের টা পরে দেখা যাবে।
বিকেল পাচটার আগ মুহুর্ত পর্যন্ত মাত্র চার টা ডেলিভারি দিতে পেরেছে অর্ণব। আজ কপালটাই খারাপ। অন্যদিন যেখানে সারাদিনে দশ বারোটা টা অর্ডার হয় সেখানে আজ এতো কম। কম বাজেট হওয়ার ফল এটাই। আশাহত হয়ে বাসায় ফিরে এলো সে। আগের চারশ টাকা আর চারটা অর্ডারে চল্লিশ টাকা করে মোট একশত ষাট টাকা, এই মোট পাঁচশ ষাট টাকা হয়েছে ওর কাছে। সেখান থেকে পঞ্চাশ টাকা নিজের কাছে রেখে বাকি পাঁচশ দশ টাকা মায়ের বিকাশ নাম্বারে পাঠিয়ে দিলো বাবার ওষুধ কেনার জন্য।
বিকেল থেকেই আকাশে মেঘ করেছে খুব। দেখেই মনে হচ্ছে আকাশের মনটা আজ ভীষণ খারাপ,, আকাশের মতো অর্ণবের মনটাও আজ খারাপ। অনার্স পাস করার পর অভাব অনটনে আর লেখাপড়া হয়ে উঠেনি। এদিকে একটা ভালো চাকরির জন্যও কম চেষ্টা করছেনা। বিবিএ পাশ করেও সিকিউরিটি আর ফুড ডেলিভারিতে কাজ করতে হচ্ছে। ইচ্ছে থাকলেও সকল চাওয়া পাওয়া পূরণ করতে পারছেনা, পারছেনা ভালো কোনো ডাক্তার দেখিয়ে বাবার শরীরে বাসা বেধে থাকা রোগটা নিরাময় করতে। এটাই বুঝি জীবন, এটাই বুঝি বাস্তবতা।
অর্ণব বালিশে হেলান দিয়ে বসে থাকে। ভাবতে থাকে সেই পুরোনো দিনের কথা। কত রঙ্গিন ছিলো সেই দিনগুলো। ভেবেছিলো, লেখাপড়া করে ভালো কিছু করবে, অভাব অনটন দূর করে বাবা মায়ের পাশে দাঁড়াবে, বাবার চিকিৎসা টা সম্পুর্ন করবে। কিন্তু সেটা আর হয়ে উঠছে কোথায়। যত চাকরি আছে, সেখানে টাকার খেলা। শুধু টাকাতেই ক্ষান্ত নয়, মামা খালুর হাতও দরকার পরে। যাদের দুটোই আছে, চাকরি টা তাদের জন্যই।
অর্ণব পকেট থেকে ফোনটা বের করে। ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে মুচকি হাসে। একটা সময় ছিলো, যখন এই ফোনে বার বার কল আসতো, কল রিসিভ না হলে কেউ একজন পাগল হয়ে যেতো। আজ সেই সব অতীত।
অভাব যতই তাকে আঁকড়ে ধরেছে, প্রিয় মানুষটা ততই আঁকড়ে ধরা বাধন ছেড়ে দূরে সরে গেছে।
অর্ণব হারিয়ে যায় সেই দিনটায়।
সময়টা কোনো এক চৈত্রের শেষের দিকে। অর্ণবের অনার্স এক্সাম সবেমাত্র শেষ হয়েছে।। তাই রিলাক্সে দেখা করতে গিয়েছে প্রিয় মানুষটার সাথে দেখা করতে। খালের পাড়ে বাড়ি সেই মানুষটার। এ গ্রামের মাতবর তার নানা। বেশ নামডাক তাদের। নানার বাড়িতেই বেড়ে উঠা তার। অর্ণব খালের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বড় গাছটার নিচে অপেক্ষা করতে থাকে। একটা সময় কাটে সেই অপেক্ষার মুহূর্ত। গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসে কাশফিয়া। অর্ণবের মুখে হাসি ফুটে আসে। কিন্তু সে হাসি বেশিক্ষণ স্থায়ী থাকেনি। কাশফিয়া তার মুখের হাসি প্রসস্থ করতে আসেনি, বরং চিরদিনের জন্য সে হাসি মুছে দিতে এসেছে।
প্রত্যেকটা বাবা মা চায় মেয়ের ভালো একটা পরিণতি হোক।। সে ক্ষেত্রে যে ছেলের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল, সে ছেলেই মেয়ের জামাই হওয়ার যোগ্যতা রাখে। কাশফিয়ার মা বাবা আর বর্তমান অভিভাবক নানাজানেরও তাই ইচ্ছে। সে তার অভিভাবকদের মনে দুঃখ দিতে পারবেনা।
অর্ণব সেদিন বাকরুদ্ধ হয়েছিলো, তবে বেঁধে রাখার মতো আধিকার তার ছিলো না। কাশফিয়া ছেড়ে যাওয়ার আগে তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিল,
"মন খারাপ করো না অর্ণব, তুমি আমার চাইতেও ভালো কাউরে পাইবা"
সেদিন অর্ণব মুচকি হেসে বলেছিলো, "তুমি তোমার নিজের ভালোর চিন্তায় নাহয় করো কাশফি, আমার চিন্তা কইরা শুধু শুধু তোমার গুরুত্বপূর্ণ সময়টা নষ্ট কইরোনা।"
অর্ণব ফিরে আসে বর্তমানে। চোখ দিয়ে এক ফোটা দুই ফোটা পানি পরছে। অর্ণব সে পানিকে তাচ্ছিল্য করে মুছে নেয় হাতের উল্টোপিঠে। রাতের ডিউটি থাকায় বিকেল বিকেল একটু বাইরে বেরোয় হাঁটার জন্য। গেইটের কাছে এসে স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে পরে সে। সামনেই মৃদুলা দাঁড়িয়ে আছে। এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে তার দিকে। অর্ণব চোখ সরিয়ে নেয় সেদিক থেকে। উল্টো পথে হাটা দেয়। মৃদুলা দৌড়ে এসে পথ আগলে দাঁড়ায়।
মৃদুলা এ বাসারই এক ভাড়াটিয়ার মেয়ে। ওর বাবা সামান্য বেতনের এক চাকরি করে। মেয়েটা প্রথম থেকেই অর্ণবকে নজরে নজরে রাখতো। একদিন সাহস করে নিজের অব্যক্ত ভালোবাসার কথা জানিয়ে দেয় সে। অর্ণব সরাসরি রিফিউজ করে দিয়েছিলো তাকে। এই জীবনে সে দ্বিতীয় ভালোবাসার সাধ চায় না।। মেয়েটি হাসিমুখে তখন বলেছিলো, "তার ভালোবাসা সে আদায় করেই ছাড়বে। অর্ণব সে কথায় পাত্তা দেয় না।
এরপর থেকে চলতে থাকে এক নাম না জানা অত্যাচার। যখন তখন মৃদুলা ভালোবাসার দাবী নিয়ে অর্ণবের সামনে হাজির হয়। অর্ণবকে দেখা মাত্রই নিজের ভালোবাসার জানান দেয়। অর্ণব বিরক্ত হয়, মাঝে মাঝে অপমানও করে খুব। মৃদুলাকে বেহায়া বলেও তাচ্ছিল্য করে। মৃদুলা হাসিমুখে সেইসব মেনে নেয়। অর্ণবের অতীত সম্পর্কে অবগত হওয়ার পরেও সে অর্ণবকেই চায়।
অর্ণব রাগী চোখে তাকিয়ে আছে মৃদুলার দিকে। মৃদুলা সে তাকানোর মাঝে ভালোবাসা খুজে পায়। সে হেসে বললো
"খেয়েছো দুপুরে?
"কেন আমায় এভাবে বিরক্ত করো মৃদুলা?
"ভালোবাসি যে।
"আমি বাসিনা।
"তবুও ভালোবাসি।
"আমি গরীব খুব, আমার দ্বারা ভালোবাসা হবেনা।
"তাও ভালোবাসি।
অর্ণব বিরক্ত হয়। সে হনহন করে চলে যায় অন্যদিকে। মৃদুলা তাকিয়ে থাকে তার চলে যাওয়ার প্রান্তে।
মাসখানেক পর কোনো এক অফিস থেকে ডাক আসে অর্ণবের। কিছুদিন আগে একটা কোম্পানির সার্কুলার চোখে পড়তেই সিভি জমা দিয়েছিলো সে। পোস্ট টাও মোটামুটি ভালো, ইনভেনটরি এসিস্ট্যান্ট মেনেজার।
অর্ণব ভেবেছিলো, এ চাকরি তার জন্য নয়, তাও জমা দিয়েছিলো। সেটারই ডাক এসেছে।।
অর্ণব ভালো শার্ট প্যান্ট পরে বেরিয়ে যায়। গেইটের কাছে যেতেই মৃদুলাকে দেখতে পায়। মৃদুলা স্মিথ হেসে জিজ্ঞেস করে
-কই যাও?
-চাকরীর ইন্টারভিউ দিতে।
-ভালো কিছুর অপেক্ষায় থাকলাম।
-মেয়েরা এটার অপেক্ষাতেই থাকে।
অর্ণবের তীক্ত কথা মৃদুলাকে ব্যথিত করেনা। বরং সে আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলো এইসব তিক্ত কথা শোনার জন্য। পুর্ব অভিজ্ঞতা আছে যে।
আজ প্রচন্ড খুশি অর্ণব। চাকরিটা হয়ে গেছে। ভাইবা, রিটেন সবকিছুতেই সে টিকে গেছে। উর্ধতন কর্মকর্তারাও বেশ পছন্দ করেছে ওকে। দেখতে শুনতে ভালো, লম্বায়ও মাশাল্লাহ। চাকরিক্ষেত্রে এটাও একটা পজিটিভ দিক। কোনো ঘোষ ছাড়ায় চাকরিটা পেয়ে যায় অর্ণব।
বাড়িতে ফোন করে বাবা মাকে সুখবর জানাতেও ভুলে না সে। তারাও বেশ খুশি।।
দিন চলছে ভালোই, ভালো একটা চাকরি, সেলারিটাও আশানুরূপ। এখন আর ফুড ডেলিভারির জবটাও করা লাগেনা। সেদিন অফিসে যাওয়ার আগে মৃদুলার সাথে রাস্তায় দেখা হয় অর্ণবের। অর্ণব জানতো মৃদুলা ওর সাথে যেচে কথা বলতে আসবেই, এটাই যে তার ক্যারেক্টর। তবে অর্ণবকে হতবাক করে দিয়ে মৃদুলা ওকে পাশ কাটিয়ে চলে যায়৷ একবার ওর দিকে তাকায়ও না পর্যন্ত। ব্যাপারটা বেশ ভাবায় তাকে।
এভাবে আরো কিছুদিন কেটে যায়৷ মৃদুলা এখন আর অর্ণবকে বিরক্ত করেনা, রাস্তাঘাটে দাড় করিয়ে ভালোবাসার কথাও বলেনা। মনের কোনো এক কোনে বেশ শূন্যতা অনুভব করে অর্ণব। এমনটা হবার তো কথা ছিলো না, তবে কেন হচ্ছে?
সেদিন ছুটির দিন হওয়ায় বাসাতেই ছিল সে। শুক্রবারের জুম্মার নামাজ আদায় করে দুপুরের লাঞ্চ সেড়ে একটু বিশ্রামের প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। তখনই নজরে আসে মৃদুলাকে। সে মাথায় কাপড় জরিয়ে গেইটের বাইরে যাচ্ছে। অর্ণব কিছু না ভেবেই তার পিছু নেয়। কাছাকাছি গিয়েই মৃদুলার হাতে ধরে টান দেয়। মৃদুলা অবাক হয় এহেন কান্ডে। অর্ণবও সাথে সাথে হাতটা ছেড়ে দেয়। আমতাআমতা করে বলে
"স্যরি, আমি আসলে হাতটা ধরতে চাইনি।
মৃদুলা হেসে বলে
"কেমন আছেন?
অর্ণব অবাক হয়। এর আগে মৃদুলা কখনোই তাকে আপনি বলে সম্বোধন করেনি। তবে আজ কেন?
অর্ণব প্রশ্ন করে
"যাচ্ছো কোথায়?
"সামনেই, দোকানে।
"ওহ।
অর্ণব কি বলবে ভেবে পায়না। মৃদুলা হেসে বলে
"কিছু বলবেন?
অর্ণব অবাক নয়নে তাকায় মৃদুলার দিকে। ভনিতা ছাড়াই প্রশ্ন করে
"এখন তোমাকে আগের মতো দেখি না যে, বাসায় থাকো না?
"বাসাতেই থাকি।
"তাহলে আগের মতো আমার ধারেকাছেও কেন যাও না? দেখলেও এড়িয়ে যাও। তোমার কি বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে? সে কি খুব ধনী?
মৃদুলা মাসে। অর্ণব অবাক হয়। সামান্য রেগে বলে
"এতে হাসির কি পেলে?
মৃদুলা হাসি থামিয়ে শান্ত গলায় বলে
"আমার বিয়ে ঠিক হয়নি, আর কোনো বড়লোক বাপের ছেলেও আমার জীবনে আসে নি।
"তাহলে? ভ্রু বাকায় অর্ণব।
মৃদুলা আকাশের দিকে তাকায়। হটাৎ চোখের এক কোনে পানির কণা জ্বলজ্বল করে উঠে। হাতের তালুতে সেটা মুছে নিয়ে বলে
"আসলে আমি যাকে ভালোবাসতাম, সে ছিলো আমার মতোই গরীব।। তখন ভালোবাসাটা সমানে সমানে ছিলো, অধিকার খাটাতে পারতাম। কিন্তু..
"কিন্তু কি? প্রশ্ন ছুড়ে অর্ণব।
মৃদুলা করুণ চোখে তাকায়। তীক্ষ্ণ গলায় বলে
"কিন্তু, আমার ভালোবাসা কে আমি কুরবান দিয়েছি সেদিন, যেদিন শুনেছি আপনি ভালো একটা চাকরি পেয়েছেন। যখন আমার মতো গরীব ছিলেন, তখনই আমি আপনাকে পাই নি, তাই চাকরি পাওয়ার পর আপনাকে ধরাছোঁয়ার সাহস করে উঠিনি। এরপরেও আমি অনেকবার যেতে চেয়েছি আপনার কাছে, কিন্তু বরাবরই মনে হয়েছে, আমি বামন হয়ে চাঁদ ছুতে চাইছি না তো!!
অর্ণব অবাক হয় মৃদুলার কথায়। মিলাতে থাকে , কাশফিয়া আর মৃদুলাকে।৷ কিন্তু এ দুই নারীর মাঝে কোনোরুপ মিল সে খুজে পায়না। মনে মনে আফসোস করে এটা ভেবে, সে মনের মধ্যে এক কয়লাকে পুষতে গিয়ে খাটি হীরাকে অবহেলা করে এসেছে এতোদিন। অর্ণব সামনে তাকায়। কিন্তু মৃদুলা কোথায়, সে তো এদিক সেদিক নেই? মুহুর্তেই কোথায় চলে গেলো? অর্ণব খুজতে থাকে তাকে। কিন্তু পায়না।।
সন্ধ্যের পরপর বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় মহল্লার ছেলেবুড়ো প্রায় সকলেই বাইরে বাতাশ উপভোগ করতে বেরোয়। অর্ণবও তার ব্যতিক্রম নয়। সেও বেরিয়ে আসে সকলের মতো। তবে গেইটের বাইরে পা দিতে পারেনি সে। এক চোখ ধাধানো সুন্দরী নারী তাকে আকৃষ্ট করে। চাঁদের আলোয় সাদা ওড়না দিয়ে মাথা ঢেকে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা তার মনের মধ্যে তুফান তুলে দেয়। অর্ণব কিছু না ভেবেই এক পা দু পা করে এগিয়ে যায় সেই ভুবন ভোলানো নারীর দিকে। অর্ণবকে নিজের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে থমকে যায় মৃদুলা।। নড়াচড়া করার শক্তিটুকুও বোধহয় হারিয়ে ফেলে সে। দৃষ্টি অর্ণবেতে আবদ্ধ।
অর্ণব কোনো কথাবার্তা ছাড়ায় খপ করে মৃদুলার হাত নিজের হাতের মুঠোয় পুরে নেয়।। মৃদুলা নির্বাক। অর্ণব সে নিষ্পাপ মুখপানে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে
'কেন আমাকে আর বিরক্ত করছোনা তুমি?
মৃদুলা হাতটা ছাড়িয়ে নেয়। অর্ণব নড়াচড়া করেনা। সে আবারো বলে
"কেন আমার রাস্তাঘাটে পথ আগলে দাঁড়াচ্ছোনা? কেন বার বার আমাকে ভালোবাসার জানান দিচ্ছো না? আমি ভেতর থেকে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছি এগুলোর অভাবে।
মৃদুলা করুণ গলায় বলে
"আমি বারবারই হাতটা এগিয়ে দিয়েছি, কিন্তু হাতটা মুষ্টিবদ্ধ করার মানুষটাকে পাইনি। আমার কি করার ছিলো তখন?
অর্ণব নিজের হাতটা মৃদুলার দিকে এগিয়ে দেয়। আবেশে বলে
'এ তৃষ্ণার্ত মরুভূমির প্রান্তরে, চাতক পাখির হাহাকারের ন্যায়,
তোমারই দ্বারে দাঁড়িয়ে,
হাতটা দিলাম বাড়িয়ে।
এ হাতে শিকল পড়িয়ে নিজের করে লও,
নইতো,
হৃদয়ের অগোচরে আমায় জলাঞ্জলি দাও।""
মৃদুলা পুর্ণ দৃষ্টিতে তাকায় অর্ণবের দিকে। এটা স্বপ্ন নয়, সত্যি। ওর ঠোঁটের কোনে পূর্ণতার হাসির আভা স্পষ্ট হয়। সে নিজের হাতটা এগিয়ে দিয়ে অর্ণবের বাড়িয়ে রাখা প্রসস্থ হাতটার মাঝে নিজের হাতের ঠাঁই দিয়ে বলে
'আমি পারবনা তোমায় জলাঞ্জলি দিতে,
পেরেছি তোমার শিকলটাকে নিজেরই মনেতে বিধিতে।
তন্বী ইসলাম
[সমাপ্ত]

Enjoyed this article? Stay informed by joining our newsletter!

Comments

You must be logged in to post a comment.