আজ শুক্রবার। সাপ্তাহিক ছুটির দিন। ছয়দিন টানা হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর রাফাত এই দিনে একটু রেস্ট নেয়। অফিস থেকে সহজে ছুটি পায় না সে। সেই সকাল ৮ টায় বের হয় আর বাসায় আসতে আসতে রাত ১০ টা বাজে। রাফাত ভেবেছিলো আজ হয়তো রূপন্তি তার সাথে একান্তে সময় কাটাবে। যেহেতু সেভাবে কাছে পায় না তাকে। কিন্তু মেয়েটা সেই সকাল ৬ টায় রুম থেকে বেরিয়েছে এখনো রুমে আসলো না। আজ আর রাফাত ফজর নামাজ পড়ে ঘুমায়নি। চোখ বন্ধ করে দেড় বছরের মেয়ের পাশে শুয়ে আছে। তার মেয়েটা একেবারে তার মতো ঠোঁট ভেঙে ঘুমায়। তার ছোটবেলার এমন একটা ছবি ফটো এলবামে দেখেছে সে। আরো কিছুক্ষন অপেক্ষা করে সে বারান্দায় গেলো।
বারান্দায় গিয়ে দেখলো রূপন্তির গোলাপ গাছটায় লাল টকটকে একটা গোলাপ ফুটেছে। বারান্দায় আরো গাছ আছে। সবগুলো গাছ রাফাত রূপন্তির আবদারে কিনে এনেছে। বিকেলে এইগাছের সাথেই সময় কাটায় সে।যদিও এখন তার মেয়েটা হওয়ার পর আর পারে না। একটা গোটা সংসার সামলিয়ে নিজের খেয়ালই রাখতে পারে না। কেমন অগোছালো হয়ে গেছে। আগে কতো সুন্দর পরিপাটি ছিলো। রাতের সময় টুকু রাফাত রূপন্তিকে কাছে পায়। আর এই সময়টা সারাদিন কাজের পরে দুজন ক্লান্ত হয়ে রেস্টের জন্য বিছানায় গাঁ এলিয়ে দেয়। একটা সময় মেসেঞ্জারে তাদের কথা হতো, লাভ ইউ, মিস ইউ ইত্যাদি দিয়ে। আর এখন কথা হয় বাবুর ডায়াপার শেষ, বাবার প্রেশার ঔষধ এনো, মায়ের ওটস শেষ, বাসায় পেঁয়াজ নেই আসার সময় নিয়ে এসো। একদিন রাফাত জিজ্ঞেস করেছিলো তোমার কিছু লাগে না? সেদিন রূপন্তি রাফাতের চুল এলোমেলো করে দিয়ে বলে,
"আমার কি লাগবে না লাগবে তারজন্য তুমি আছো। আর এই সংসারের কি লাগবে না লাগবে তারজন্য আমি। সংসার দেখবো আমি আর আমাকে দেখবে তুমি।"
সকালের রোদের প্রখরতা একটু একটু করে বাড়ছে। ভাবনাচ্ছেদ হলো মেয়ের কান্নার শব্দে। তড়িঘড়ি করে সে রুমে আসলো।
বাবাকে দেখার পর মেয়ের কান্না অটোমেটিক বন্ধ হয়ে গেলো। একগাল হেঁসে হাত বাড়িয়ে দিলো কোলে নেওয়ার জন্য। সব বাচ্চা মা ভক্ত হলেও রাফাতের মেয়ে বাবা ভক্ত। বাবাকে পেলে তার কাউকে লাগে না। খাওয়ার সময়টা শুধু মায়ের কাছে যায়। সে খুবই কমই ঘুম থেকে উঠে বাবাকে দেখে। সন্ধ্যায় ঘুমিয়ে রাত ১০ টা অব্দি সজাগ থাকে বাবার জন্য। এটা নিয়ে রূপন্তি মাঝে গাল ফুলায়। বলে,
"দেখেছো ফাজিল মেয়ের কান্ড সারাদিন থাকে আমার কাছে থাকে অথচ বাবাকে দেখলে সে জীবন দেয় আর আমার কাছে আসতে চায় না। বাবা স্পর্শ করলে কান্না বন্ধ হয়ে যায়।"
মেয়েকে কোলে নিলো সে। আহা এ যেন এক অন্যরকম প্রশান্তি। মেয়ে কোলে উঠে রাফাতের গাল ধরছে চুমু দিচ্ছে। তাকে কোলে নিয়ে ডাইনিং রুমে গেলো। সেখানে গিয়ে দেখে রূপন্তি রুটি আলুভাজি টেবিলে দিচ্ছে। রাফাত কে দেখে বললো,
"ওঠে গেছো তুমি? সাথে আবার রাজকন্যাকেও নিয়ে এসেছো।দাও ওকে আমার কোলে দাও। তুমি টেবিলে বসো আমি বাবাকে ডেকে আনছি। সেই কখন ওনি এক কাপ চা খেয়েছে। মায়ের রান্নাটা চুলোয় বসিয়েছি।" কপট রাগ দেখিয়ে রাফাত বলল,
"মেয়েটা উঠে কান্না করলো। রুমে গেলে না একবার। যদি বিছানা থেকে পড়ে যেতো?"
মেয়েকে কোলে নিতে নিতে রূপন্তি বলে,
"আজ শুক্রবার মেয়ের আদরের বাপ যে মেয়ের কাছে আমি জানি তাই যাইনি। এখন ঢং বাদ দিয়ে বসো বাবাকে ডেকে আনি।"
নাস্তা শেষ করে মেয়েকে খাইয়ে রূপন্তি গেলো শ্বাশুড়ির কাছে। তাকে খাওয়াতে হবে। মেয়ে তার দাদুভাইয়ের সাথে খেলছে। আর রূপন্তি তার শ্বাশুড়িকে খাওয়াচ্ছে। দরজায় দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখছে রাফাত। খাওয়ানোর ফাঁকে ফাঁকে ওনার চোখ মুছে দিচ্ছে রূপন্তি। রাফাত জানে রোজ যখন রূপন্তি ওনাকে খাওয়ায় তার মা কাঁদে। রাফাত একমাত্র সন্তান হওয়ায় ওনার অনেক ইচ্ছে ছিলো নাতি নাতনি খেলবেন কিন্তু এখন সয্যাশায়ী। বিয়ের ছয়মাসের মাথায় ওনি স্ট্রোক করে বাম পাশ প্যারালাইজড হয়ে গেছে। মুখে কথা আটকায়। রাফাত ভেবে পায় না এরেন্জ ম্যারেজে এতো তাড়াতাড়ি কি করে একটা মেয়ে সবাই কে আপন করে নিতে পারে। কি সুন্দর সংসার সামলাচ্ছে। মায়ের অসুস্থতার মাস চারেক পরে জানতে পারে নতুন অতিথি আসার কথা। সেদিন সবাই খুশি হয়েছিল। কেঁদেছিল রাফাতের মা। নিরবে চোখের পানি ফেলেছেন। কারণ এই পোয়াতি মেয়েটার সেবা ওনি করতে পারবেন না। কতো শখ ছিলো তার নাতি নাতনির আগমনে বউকে এটা ওটা বানিয়ে খাওয়াবেন। কিন্তু এখন তা সম্ভব না। ভারী পেট নিয়েও রূপন্তি একা হাতে এই সংসার সামলেছে। লেবার পেইন উঠায় সে নিজেই হাসপাতালে কল করেছিলো। কাকে বলবে বাসায় যে কেউ ছিলো না।
প্রেগ্ন্যাসির সময় রাফাত একদিন বলেছিল,
"পেটের দায়ে অন্যের গোলামি করি। তোমাকে সময় দিতে পারি না কাজের চাপে। যেখানে সবাই তোমার যত্ন নেওয়ার কথা সেখানে তুমি সবার যত্ন নিচ্ছো। অফিস থেকে এসে যখন তোমার ক্লান্ত মুখটা দেখি ভিতরটা কেমন দুমড়েমুচড়ে যায়। তুমি প্লিজ নিজের যত্ন নিও।ঠিকমতো খাবার খেও। তুমি ছাড়া আমরা সবাই অচল। সংসারের মধ্যমনি তুমি।" বিনিময়ে সেদিন শুধু রূপন্তি রাফাতের বুকে মাথা রেখেছিলো।
শ্বাশুড়িকে ঔষধ খাইয়ে ওনার মুখ মুছে রূপন্তি বলে,
"এভাবে বাচ্চাদের মতো কান্না করলে চলে। আপনার না শখ নাতনি নিয়ে খেলবেন। তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠুন মা। মনে জোর বাড়ান ইনশাআল্লাহ পারবেন। এখন একটু ঘুমিয়ে নিন। বাবা বাহিরে গেছে। একটু পর চলে আসবে।"
রান্না ঘরে এটো প্লেট বাটি পরিষ্কার করতে গিয়ে দেখে সেগুলো পরিষ্কার করে রাখা। রুমে গিয়ে দেখে বাবা মেয়ে খেলছে। রাফাতের সামনে গিয়ে রূপন্তি বলে,
"তোমাকে প্লেট বাটি পরিষ্কার করতে কে বলেছে? সারা সপ্তাহ তো অফিস করো। রেস্ট নাও এই দিনটা। প্রতি শুক্রবার কিছু না কিছু তোমার করা লাগবেই।"
রাফাত মেয়ের দিকে তাকালো। মেয়ে তার আপন মনে খেলছে। হাত টেনে রূপন্তিকে তার পাশে বসালো।
"সারাদিন কতো কাজ করো তুমি। সংসারের সবদিকে তোমার নজর। অন্যদিনে তো সাহায্য করতে পারি না শুক্রবারে না হয় করলাম। আমি তো একটা দিন ছুটি পাই তুমি তো তাও পাও না। তাই এটা ওটা করে তোমার কষ্ট কমাই। কত করে বললাম একজন কাজের লোক রাখি। কিন্তু তুমি তো তুমিই।"
"একজনের ইনকামে এতোদিকে টাকা খসালে হবে? মায়ের ঔষধ বাবার ঔষধ সংসার খরচ আবার মেয়ের খরচ বাসা ভাড়া সবকিছু দিতে গিয়েই তো হিস শিম খাও। তার চেয়ে ভালো তুমি যেমন কষ্ট করছো আমিও করি। কাজ গুলো নিজের সংসারে করছি। অন্যের সংসারে তো না।"
"তারপরও তো তোমার কোনো শখ আহ্লাদ পূরণ করতে পারি না। আচ্ছা রূপন্তি তোমার কখনো মনে হয় না এই সংসারে কামলা দিয়ে তোমার লাভ কি? আমার বাবা মা কে সেবা করে তোমার কি লাভ?" রূপন্তি রাফাতের কাঁধে মাথা রেখে বলে,
"আমার সকল শখ আহ্লাদ তো তুমি। তুমি আমার সবকিছু। বাপ মা ম/রা মেয়ে ফুফুর বাড়িতে হেলায় অবহেলায় বড় হয়েছি। সেই এতিম মেয়েকে তোমরা বউ করে এনেছো। একটা পরিবার দিয়েছো। তাদেরকে বাবা মা বলে ডাকি তাদের সেবা করবো না? আজ নিজের মা অসুস্থ হলে সেবা না করে থাকতে পারতাম? বাবা যখন মাঝে মাঝে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় তখন মনে হয় এটাই প্রাপ্তি। আজকাল কয়টা মেয়ে শ্বশুর শ্বাশুড়ি নিয়ে সংসার করতে পারে বলো তো?"
"আচ্ছা সব কথা বাদ। আজ শুক্রবার তোমার ছুটি। তোমার সব কাজ আমি করবো। রান্না করা, মা কে খাওয়ানো, এক বালতি কাপড় যে ভিজিয়েছো সেগুলো ধুয়ে দিবো।না করতে পারবে না। একটা দিন না হয় তুমিও ছুটি পেলে ক্ষতি কি?" কাঁধ থেকে মাথা তুলে রূপন্তি বলে,
"এই না না তোমাকে কিছু করতে হবে না। তুমি বরং রেস্ট নাও।"
"তা বললে তো শুনছি না ম্যাডাম আজ সব কাজ আমি করবো। ঘরের রাণীকে একটু ছুটির স্বাদ দিবো এই আর কি।" রূপন্তি মুচকি হেসে বলে,
"আচ্ছা ঠিক আছে করবে কিন্তু আমিও তোমাকে সাহায্য করবো। না হলে কিন্তু মানবো না।"
"ওকে ম্যাডাম সাহায্য করবেন তবে দূর থেকে ঠিক আছে।"
সমাপ্ত
অণুগল্প
শুক্রবারের_ছুটি
© রূপন্তি রাহমান (ছদ্মনাম)
You must be logged in to post a comment.