আম্মাকে চোর সাব্যস্ত করে রীতিমতো বিচার সালিশ চলছে! দশ বছরের বালক এই আমি অবাক চোখে সব দেখে যাচ্ছি। নাটক, সবই নাটক!
এরই মধ্যে ছোট চাচা দু দুবার তেড়েও এসেছে, মাকে মারবে বলে। সেই সাথে সকাল থেকে একটানা অশ্রাব্য গালি গালাজও চলছে! আমার মায়ের পক্ষে কথা বলার মতো একটা লোকও এখানে নেই!
প্রচন্ড অপমানিত অসহায় আমার মা দরজা লাগিয়ে, সকাল থেকে ফুপিয়ে কাঁদছেন। শুধু আমি আর আমার বড় ভাই নয়, এ বাড়ির সবাই জানে মা আসলে নির্দোষ! ছোট বোনটার বয়স সবে তিন, ও ঘটনার কিছুই না বুঝে ফ্যাল ফ্যাল দৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাকিয়ে! মাঝে মধ্যে মায়ের সাথে সুর তুলে কাঁদছে। তিন নাবালক সন্তানের এক বিধবা মায়ের আহাজারি কাঁদছে। ধ কারো হৃদয় স্পর্শ করেনি।
আমার বাবা আব্দুল হাকিম, এ বাড়ির বড় ছেলে। লালপুর বাজারের সবচাইতে বড় মুদির দোকানটা আমার বাবার হাতেই গড়া। এই যে আমার তিন চাচা আর দুই ফুপু আজ এ বাড়িতে মাকে চোর বলে তর্জন গর্জন চালাচ্ছে। এদের প্রত্যেকের বেড়ে উঠা, লেখাপড়া এমনকি বিয়ে, সবকিছুই বাবার আয় থেকেই। দাদার অকাল মৃত্যুর পর এ সংসারে বাবাই একমাত্র উপার্জনকারি, বহুবছর ধরে।
ভৈরব বাজার থেকে নৌকা বোঝাই দোকানের মাল আনতে গিয়ে মেঘনা নদীতে একদিন নৌকা ডুবি, হঠাৎ বয়ে যাওয়া এক দমকা ঝড়ে! আমাদের দূভার্গ্য মেঘনা পাড়ের আজন্ম সাতারু আমার বাবার লাশ সেদিন মিললো রায়পুরায়, তা ও আবার ঝড়ের দুদিন পর। ঐদিনের ঐ ঝড়টায় শুধু বাবার মৃত্যুই হলো না, মাকেও একেবারে শূন্য করে দিয়ে গেল।
এ বাড়ির সবার শ্রদ্ধেয় বড় বৌ, স্বামী মৃত্যুর এক মাসের মাথায় বাড়ির কাজের লোক বনে গেল। দুই ছেলে আর এক মেয়ে নিয়ে নিজ বাড়িতেই যেন পরবাসী। দয়া দাক্ষিন্ন্যে তার বেঁচে থাকার জীবনের শুরু। সকাল বিকাল শুধুই অপমান আর গন্জনা! আর বাড়ির সব কাজ নিঃশব্দে করে যাওয়া।
চাচারা আমার বাবার দোকানের দখল নিয়ে নিল, সেই সাথে বাবার কষ্টের টাকায় কেনা চার কানি ধানি জমিও। মা সহ আমরা তিন ভাইবোন এ পরিবারের বোঝা, এটা বুঝার মতো আমার বয়স তখনই হয়ে গেছে। তাইতো নিজের মায়ের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ কিংবা অপমানে, আড়ালে কাঁদি। আজ যখন ওরা মিথ্যে সালিশ বসালো, আমার নিজেরই মরে যেতে ইচ্ছা হল।
আমাদেরকে বাড়ি ছাড়া করবে, এই উদ্দেশ্যেই দশ হাজার টাকার একটা বান্ডিল মায়ের বিছানার নীচে। হায়রে স্বার্থপর মানুষ! মায়ের একটাই অপরাধ সগীর ভাইয়ের এসএসসি পরীক্ষার ফরম ফিল আপের টাকা দেবরদের কাছে চাওয়া। দোকানের আয় থেকেই। আমার বড় ভাই সগীর, প্রচন্ড মেধাবী। গ্রামের স্কুলে এত ভালো ছাত্র সচরাচর মিলে না।
অনেকদিন ধরেই বাবার ভাইবোনেরা সম্পত্তি ভাগাভাগির বিষয়ে শলাপরামর্শ চালাচ্ছে। আমরা দু ভাই বড় হয়ে যাচ্ছি, এ ভয় থেকেই আমাদেরকে বাড়ি ছাড়ার এ নাটক! তারপর নিজেদের মতো সম্পত্তির বাটোয়ারা হবে, আমাদেরকে বঞ্চিত করে। পুরো ঘটনাটাই যেন হৃদয় বিদারক এক বাংলা সিনেমার গল্প।
সালিশ শুরু হওয়ার আগে আগেই আম্মা আমাদের তিনভাইবোনকে নিয়ে নিঃশব্দ রওনা দিল, নানার বাড়ি আমতলীতে। চলে যাওয়ার সময়টায় আমার চাচা ফুপুদের বিদ্রূপ আর হাসাহাসি, প্রায় এক যুগ পর এখনো আমার কানে ভাসে!
আমাদের ভাগ্য ভাল নানী তখনো জীবিত। তবে নানার বাড়িতে এসেও সেই একই বিপদ। তিন মামা একাট্রা আমাদের এ বাড়িতে জায়গা দিবে না। বড় বোনের পক্ষ হয়ে যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ওদের লড়ার কথা, সেটাতো করেই নি বরঞ্চ দূর দূর করে আমাদের তাড়িয়ে দেয়।
ভাইদের আচরণে আম্মা যারপরনাই অবাক হলো। অথচ বিয়ের আগ পযর্ন্ত এই ভাইদেরকেই আম্মা এক হাতে দেখভাল করেছেন। আমার বাবা জীবিত অবস্থায় এদের প্রত্যেকেই বোন দুলাভাই বলতে অজ্ঞান। প্রয়োজনে বা অপ্রয়োজনে দুলাভাইয়ের কাছ থেকে সাহায্য নিয়েছে। আজ নিজ ভাইদের এ ধরনের অকৃতজ্ঞ ব্যবহারে মা ভীষণ অবাক। অসহায় এই আমাদের যে যাওয়ার আর কোন গন্তব্যই নেই!
কাহিনীর এ পর্যায়ে আজকের এই গল্পের নায়িকা হালিমা খাতুনের আবির্ভাব। হ্যাঁ, হালিমা থানা কান্দি গ্রামের মুন্সী বাড়ির বড় মেয়ে। বনেদী পরিবারের এই মহিলা সম্পর্কে আমার নানী হন। তার বড় মেয়ের এই ঘোর দূর্দশায়, মেয়েকে কিন্তু ঠেলে দেননি। নানা মারা যাওয়ার পর থেকে নানি সম্ভবত ছেলেদের সংসারে কোন ঠাসা অবস্থায় ছিল। আগে থেকেই আমরা জানতাম মামীদের সাথে নানীর সম্পর্ক ভালো নয়!
আমাদের অসহায় অবস্হা বা ছেলেদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, কারণ যেটাই হোক না কেনো। নানী, মা ও আমাদের তিন ভাইবোনদের নিয়ে সেদিনই সোজা থানাকান্দি চলে এলেন, নিজ বাবার ভিটে বাড়িতে। তার বাবার কাছ থেকে পাওয়া চার শতক জমির উপর পুরনো একটা একচালা টিনের ঘরেই আমাদের নতুন জীবনের শুরু হল।
নানীর ছোট দুই ভাই তখনো জীবিত। বড় বোনকে বেশ সমীহ করে চলে। নানীর ভাইরা খুব বেশি অবস্হা সম্পন্ন না হলেও আমাদের অসহায় পরিবারটাকে যথাসম্ভব সহায়তা করার চেষ্টায় ছিল। আমারও এক আধ পেট খেয়ে খুশি, অন্ততপক্ষে অত্যাচার থেকে মুক্তি পাওয়ার আনন্দেই।
এর কিছুদিন পর আমার নিজ মামারা এসে প্রথমে নানীকে এরপর আমাদেরকেও নিয়ে যাওয়ার শত অনুরোধ জানায়। নানী অবশ্য এরই মধ্যে নিজ ছেলেদের উপর আস্হা হারিয়ে ফেলেছেন। তাইতো নিজে পাকাপাকিভাবে আর আমতলী যাননি, আমাদেরকেও যেতে দেননি। তবে মাঝে মধ্যে ছেলের ঘরের নাতি নাতনিদের দেখার জন্য অল্পদিনের জন্য বেড়াতে যেতেন। ব্যস, ছেলেদের সাথে তার সম্পর্ক এতটুকুনই!
এরপর আমাদের পরিবারের কঠিন সময়ে হালিমা খাতুনের একটা সাহসী সিদ্ধান্ত! মুন্সী বাড়ির বড় মেয়ে আমার নানীর বিয়েতে বাবার বাড়ি থেকে উপহার দেওয়া গলার বড় হার বিক্রি করে দেওয়া। নানী নিজেই বাইশমৌজা বাজারে গেলেন। স্বর্ণকারের দোকানে যাচাই বাছাই করে বেশ ভালো অংকের টাকায় ওটা বেচেও দিলেন। এরপর একটা বাছুর সহ গাভী, বাড়ীর উঠানে সব্জি আর নানীর ভাইদের সহায়তায় কষ্টে সৃষ্টে আমাদের পাঁচ জনের এ অসহায় পরিবারের জীবন চলা।
স্হানীয় লোকজনের কাছেও আমরা কৃতজ্ঞ, নানাভাবে ওদের করা সহযোগিতায়। এই যেমন আমার আর সগীর ভাইয়ের স্কুলের বেতন মওকুফ করানো কিংবা আমাদের নিয়মিত খোঁজ খবর নেওয়া।
এরপর সগীর ভাই এসএসসিতে ভালো ফল করে ভৈরব কলেজে, লজিংয়েরও ব্যবস্হা হয় থানাকান্দির একজনের সহায়তায়। এইচএসসিতে সগীর ভাইয়ের ভালো ফল করা, চিটাগাং ভার্সিটিতে ল ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই যেন হত দরিদ্র এই পরিবারে মুক্তির বাতাস বইতে শুরু!
ভার্সিটিতে সগীর ভাইয়ের একটানা টিউশনি আর সাথে মনোযোগী পড়াশোনা, যে কাউকেই অবাক করবে। সেই সাথে রোজ মাসে নিয়ম করে বাড়িতে অল্প হলেও কিছু টাকা পাঠায়। মা আর নানী এই টাকা পেয়েই সে কি উৎফুল্ল, সুদিনের আভাস পেয়েই।
সগীর ভাই যখন মাস্টার্স পাশ করে, আমি ততোদিনে ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে গেছি, ক্লাস শুরুর অপেক্ষায়। এর কিছুদিন পরই সগীর ভাই জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে সুপারিশ প্রাপ্ত হয়। ব্যস, কাহিনীর সমাপ্তি এখানেই।
আজ লালপুরের মানুষজন তাদের ভবিষ্যৎ "জজ" সাহেবকে দেখার জন্য দলে দলে হাকিম মিয়ার বাড়িতে উপস্হিত। সবার চোখে মুখে গ্রামের সন্তানের সাফল্যে গর্বের ছাপ।
আমার চাচাদের অবস্হা অবশ্য ততোদিনে খুব দূর্বল। দোকানের অস্তিত্ব নেই, কিছু জমিজমাও বিক্রিও করে দিয়েছে। নিজ আপন ভাতিজা ভবিষ্যৎ "জজ" সাহেবকে বসতে দেওয়ার মতো ব্যবস্হা নেই বলে তারা বেশ লজ্জিত।
স্হানীয় চেয়ারম্যান সহ আরো গন্যমান্য ব্যাক্তিরা আজ প্রকাশ্যে আমার চাচা ফুপুদের ভৎসর্নায়! অতি উৎসাহি কেউ কেউ আবার তেড়েও যাচ্ছে ওদের মারতে। আমার আর সগীর ভাইয়ের ক্ষোভটা অবশ্য তখনো অনেক, তবে পরিবারের কথা চিন্তা করেই শান্ত থাকলাম। একটাই চাওয়া মায়ের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে নেয়। কাউকে কিছু বলতে হয়নি, নিজে থেকেই ওরা লজ্জায় মায়ের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিল। মুহুর্তেই মা এই পরিবারের শ্রদ্ধা ভাজন। সেই আগের বড় ভাবির মর্যাদায়।
এই গল্পের নায়িকা হালিমা খাতুন, আমার অশীতিপর নানী কিন্তু আজ আমাদের সাথেই, মুখে তার বিজয়ী হাসি। বাবার গড়া বড় ঘরটা সেদিনই আমাদের জন্য ছেড়ে দেওয়া হল। নানীসহ আমরা যেন খুব দ্রুতই লালপুরে চলে আসি, গ্রামবাসীরও এখন জোর দাবি।
আজ ইন্জিনের বড় নৌকাটায় আমাদের থানাকান্দি ফেরার পথটা যে কতো আনন্দের, তা বলে বোঝানো যাবে না। ভরা পাগলা নদীর সৌন্দর্য আবিস্কার করলাম নতুনভাবে। মায়ের চোখে আনন্দাশ্রু আর বোনটার মুখে হাসি। আর আমার নানী হালিমা খাতুন, নৌকার লোকদের সাথে সারাক্ষণই নাতিদের নিয়ে গর্বে ব্যস্ত।
সগীর ভাই আর আমি বড় নৌকাটার ছাউনির উপর বসে আছি। দুজনই শৈশব কৈশোরের স্মৃতি রোমান্হনে। আমাদের সুদিন আসছে এই ভেবেই আমি খুশি। হঠাৎ সগীর ভাইয়ের দিকে চোখ পড়তেই কিছুটা চিন্তিত মনে হল। কারণটা জানতেই আমার মনটাও খারাপ হয়ে গেল। ওর মাথায় এখন নানীর বিক্রি করে দেওয়া ঐ স্মৃতি বিজরিত দামী গলার হারটার কথাই ঘুরছে। একটা পরিবারকে ঘুরে দাড়ানোর প্রারম্ভিক সেই সম্বল!
সগীর ভাইয়ের স্বপ্ন যতো দ্রুতই নানীকে বিক্রি করে দেওয়া ঐ গলার হারটা ফিরিয়ে দেওয়ার! আমি জানি ঐ গয়নাটা হয়তো এখন আর পাওয়া যাবে না, তবুও সগীর ভাইয়ের দেখে যাওয়া স্বপ্নটা আমাকেও ভীষণ আপ্লুত করে। এ যেন নানী নয়, আমাদের পরিবারের সবার প্রতিই সগীর ভাইয়ের ভালোবাসার তীব্র বহিঃপ্রকাশ। অনন্য দ্বায়িত্ববোধ।
কিভাবে যেনো আজ থানাকান্দির মানুষরাও জেনে গেছে আমাদের বড় এই বিজয়ের কথা। নৌকা ঘাটে অনেক মানুষের জমায়েত, আমাদেরকে বরন করে নিতেই। প্রত্যেকের চোখে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা। মুহূর্তেই আমরা হয়ে গেলাম অসহায় নির্যাতিত আর বঞ্চিত লোকদের আশার প্রতীক। আশে পাশের দশ গ্রামের লোকদের আলোচনার প্রধান বিষয়।
রাতে সগীর ভাইই নানীকে ওর বয়ে যাওয়া কষ্টের কথাটা শেয়ার করলো। নানীর বিয়েতে পাওয়া বড় গয়নাটা আমাদের কষ্ট লাঘবে অবলীলায় বিক্রি করে দেওয়ার গল্পটা।
" অত্ দিন পর ইতা কি কছ বাই, তরাইতো আমার একেকটা হীরার জেওর!"
অশীতিপর নানীর এ কথা শুনে আমরা তিন ভাই বোনই স্তদ্ধ! হঠাৎ করেই ঘরে একটা উচ্চস্বরে কান্নার শব্দে পিনপতন নীরবতা। সব কিছু মিলিয়েই আমাদের মমতাময়ী মা সম্ভবত আজ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। কান্নার বৃষ্টিতে বঞ্চিতা ও নিপীড়িতা মায়ের কষ্ট মুছে ফেলার জন্য আজকের এই দিনটা যে বড় মানানসই!
বঞ্চিতা
লিখাঃ ইমাম হোসাইন
You must be logged in to post a comment.