Top: নীলাভ্র আর নীলাম্বরীর গল্প

আজকে আমার ফুফাতো ভাইয়ের বিয়ের জন্য মেয়ে দেখতে যাচ্ছি। এই দুই বছরে প্রায় 34 খানা মেয়ে দেখা হয়েছে, প্রায় প্রতি সপ্তাহে আমরা মেয়ে দেখতে যাই। আজকে 35 নম্বর মেয়ে দেখা হবে ফুপাতো ভাই সাজ্জাদের জন্য। এই দুই বছরে মেয়ে দেখতে দেখতে সাজ্জাদ ক্লান্ত হয়ে গেছে। বিয়ের বয়স পার হয়ে যাচ্ছে এটা যেন ফুপির চোখে পড়েনা, সাজ্জাদ ভাইয়ের বয়স 33 বছর চলে, অনার্স মাস্টার্স শেষ করে চাকরি করতেছে পাঁচ বছর ধরে। একমাত্র ছেলে বলে কথা ছেলের বউ হবে সর্বগুণে সম্পূর্ণা, কিন্তু একটা মেয়ের ভিতর 100% গুণ খুঁজে পাওয়া কঠিন তাই সাজ্জাদ ভাইয়ের ভাগ্যে বিয়ে নামক সুখের দেখা অনিবার্য কারণে স্থগিত হয়ে যাচ্ছে।
ফুপির চাই এমন মেয়ে যে সবদিক দিয়ে পারদর্শী হবে, রূপে-গুণে শিক্ষা আদব-কায়দা অতুলনীয়, দশটা কথা বললে উত্তর দিবে না, মুখ বুজে সহ্য করে নিবে। সন্ধ্যে হলে শাশুড়ির পায়ে সরিষার তেল মালিশ করে দেবে মাথা টিপে দেবে।
এগুলো শুনে আমার হাসি পায়, ফুপি আছে আদিম যুগে, এখন এমন মেয়ে খুঁজে পাওয়া যায় না, সেটা তার মাথায় ঢুকছেনা। তাই মেয়ে দেখতে দেখতে 34 পার করে ফেলেছে। সাজ্জাদ ভাই রাগে ডিসিশন নিয়েছে নিজের বিয়ে নিজে করবে আর তার মায়ের উপর নির্ভর করে থাকবে না। সাজ্জাদ ভাই ভালোবেসেছিল একটা মেয়েকে তখন সে কলেজে পড়ে, মেয়েটার বিয়ে হয়ে যায় তারপর থেকে সে আর কারো সাথে রিলেশন করে নি। ফুপি অনেক জোরাজুরি করে শেষবারের মত মেয়ে দেখতে যাবার জন্য সাজ্জাদ ভাইকে রাজি করাতে বলল আমাকে।
আমি ফুপিকে বললাম, আমি পারবো না, আমার মনে হয় তুমি সারাজীবন মেয়ে দেখে দেখে পার করে দিবে, তোমার ছেলের বউ নাতি-নাতনি দেখার শখ পূরণ হবেনা, এরমধ্যে সাজ্জাদ ভাইয়ের চুল পেকে সাদা ধবধবে হয়ে যাবে। আমার কথা শুনে ফুপি আমার গালে একটা চড় মেরে দিল, তবে চড়টা আস্তে মারছে।
বেয়াদব ছেলে মুখে মুখে কথা বলিস, যা বলছি তাই কর সাজ্জাদকে রাজি করিয়ে ফেল আজকে আমার সাথে যেতে। কথা দিচ্ছি মেয়ে পছন্দ হলে, মানে তোদের পছন্দ হলে আজকে বিয়ে ঠিক করে ফেলবো।
সত্যি কথা দিচ্ছো, দেখবে কথা যেন আর নড়চড় না হয়।
সত্যি কথা দিচ্ছি, আমিও ক্লান্ত হয়ে গেছি, মানুষ হাসাহাসি করে এখন আমার ছেলের বিয়ে নিয়ে। বলে একটা মাত্র ছেলের বিয়ে দিতে পারছেন না, ছেলে তো আইবুড়ো হয়ে যাচ্ছে।
ঠিকই তো বলে, মানুষ সেটা বুঝে তবু তুমি বুঝতে পারছ না, সাজ্জাদ ভাইয়ের কিন্তু অর্ধেক বয়স পার হয়ে গিয়েছে।
এখন আর বেশি কথা বলিস না, সাজ্জাদকে রাজি করিয়ে রেডি হ, তোর মাকে বলিস আমার সাথে যেতে।
ঠিক আছে আম্মুকে নিয়ে দুপুরের পরে তোমাদের বাসায় আসব।
আমরা মেয়ে দেখতে এসেছি মিরপুর 2 নাম্বার, মেয়ের বাবা পুরান ঢাকায় পেঁয়াজের ব্যবসা করে, তাদের আদি নিবাস পুরান ঢাকায়, মিরপুর 2 ফ্ল্যাট কিনে এখানে থাকে। আমি সাজ্জাদ ভাই আম্মু ফুপি আঙ্কেল আর আংকেলের বন্ধু মেয়ে দেখতে এসেছি। আমাদেরকে নাস্তা খেতে দিল, নাস্তা খাওয়া শেষ হলে লাল টুকটুকে শাড়ি পরে মিডিয়াম গড়নের স্বাস্থবান একজন মেয়ে চা নিয়ে আসলো। মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম মোটামুটি বয়স 27 28 এর কাছাকাছি হবে। মেয়ে নাকি মাস্টার্স পাস করেছে জবের জন্য ট্রাই করছে। ফুপি মেয়েকে গরু দেখার মত দেখতে চাইল, মা তোমার হাত দেখাও তো পা দেখাও তো, এবার শাড়িটা একটু উচু করে ধর দেখিতো। তুমি ভালো চা কফি বানাতে পারো কি না, তোমার উচ্চতা কত? ওজন কত? ফুপির এরকম প্রশ্নে সব সময় রাগ উঠে আমার। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মেয়েটা তার মাথা থেকে শাড়ির আঁচলটা ফেলে দিল, তারপর চুলগুলো এলোমেলো করে বলল আন্টি হাত-পা দেখলেন চুল কত লম্বা দেখলেন মাথায় কতগুলো চুল আছে এগুলো গুণে দেখুন। আমাকে আপনি কিনতে এসেছেন বলেন কত টাকা দাম দিবেন, এইভাবে কতগুলো মেয়েকে দেখে কত করে দাম দিয়েছেন বলেন। মেয়ের কথায় ফুপির চোখ দুটো ডিমের মতো গোল হয়ে গেল, সে কয়েকবার ঢেকুর তুলে বললেন।
এই তুমি এমন কেন তোমার লজ্জা শরম নেই, কিভাবে কথা বলতে হয় অপরিচিত মানুষের সাথে তোমার পরিবার তোমাকে শেখায়নি। আমরা তোমাকে দেখতে এসেছি, আর তোমার এমন আচরণ।
বাহ আমাকে দেখতে এসেছেন, আমাকে কি মনে করতেছেন মানুষ নাকি কোন পশু, আপনাদের সাথে পুরুষ মানুষ এসেছে এদের সামনে আপনি আমার হাত-পা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে চাইছেন। আমি কতটুকু আমার চুল কত লম্বা, আমার পড়নের শাড়ি উপরে উঠিয়ে হাটু পর্যন্ত দেখতে চাচ্ছেন এতে কি আপনার লজ্জা করছে না। আচ্ছা আমি আপনার ছেলেকে দেখব ছেলের উচ্চতা কত, ওজন কত, আমারও অধিকার আছে সবকিছু খুটিয়ে খুটিয়ে দেখার। আর আপনি কেমন বলেনতো একজন মেয়ে হয়ে আরেকজন মেয়েকে এভাবে অসম্মান কিভাবে করেন।
ফুপি উত্তেজিত হয়ে বললেন, আমি চাই শান্ত ভদ্র অমায়িক সংসারের কাজকর্ম জানে এমন বউ, আমার মুখে মুখে তর্ক করবে না আমাকে ভালোবাসবে।
আমি আপনাকে মায়ের মত ভালোবাসবো, মুখে মুখে তর্ক করবোনা, সব কাজ করব, কিন্তু আপনাকে তো আমার মা হতে হবে, আমাকে আপনার মেয়ের মত ভালোবাসতে হবে। এভাবে যদি মেয়ে দেখেন কখনো কোনো ভালো মেয়ে পাবেন না।
মেয়ের নাম জলি, তার উচিত কথায় ফুপি জব্দ হয়েছে দেখে আমার খুব আনন্দ লাগছে। জলি সাজ্জাদ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, আপনার মায়ের দেখা মেয়ে বিয়ে করতে চাইলে এজনম অপেক্ষা করতে হবে।
ফুপি বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো, সাজ্জাদ এখানে আর এক মিনিটও না। মনে হয় আকাশ থেকে বজ্রপাত হলো ফুপির গলার আওয়াজে। সাজ্জাদ ভাই বলে ফেলল, আমি এই মেয়েকে বিয়ে করবো। সাজ্জাদ ভাইয়ের কথা শুনে ফুপির হার্ট অ্যাটাক হবার মত অবস্থা।
কি বললি তুই, এই অসভ্য মেয়েকে বিয়ে করবি, আর দুনিয়ায় মেয়ে খুঁজে পাবি না এই মেয়ে ছাড়া।
না পাবো না, তুমি যদি এমন করো কখনো আমি বিয়ে করতে পারবোনা। 34 বার মেয়ে দেখেছো একটাকেও পছন্দ করো না, আমি এই মেয়েকেই বিয়ে করব।
ফুপি আমাদের রেখে চলে আসলো, সাজ্জাদ ভাই আমি আঙ্কেল আংকেলের বন্ধু সাজ্জাদ ভাইকে নিয়ে আসতে চাইলাম, তার এক কথা এই মেয়েকে বিয়ে করব না হলে আর বিয়ে করব না। তারপর কি ছেলের কথা রক্ষার্থে সাজ্জাদ ভাইয়ের বাবা বিয়ে ঠিক করে চলে আসলো। যেমন বউ খুঁজে ছিল রূপে-গুণে সবদিক দিয়ে অনন্যা। এখন ছেলের বউ জব করে, ফুপি চুপচাপ রান্না করে রেখে দেয়, যদি ভাবীকে একটা কথা বলে দশটা কথা শুনতে হয়। মাঝে মাঝে আমি ফুপিকে বলি এতগুলো মেয়েকে যদি না দেখতে হয়তো এরচেয়ে ভালো বউ পেতে, তোমার সর্বগুণে সম্পূর্ণা বউ চাই এখন কয়টা গুন পেয়েছ হিসাব করে দেখো।
ফুপি বলে, আর লজ্জা দিস না আমাকে, বেশি বেশি করতে যেয়ে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মেরেছি।
সমাপ্ত
মেয়ে_দেখা
সাদমান_হাসিব

Enjoyed this article? Stay informed by joining our newsletter!

Comments

You must be logged in to post a comment.