"মেয়ে মানেই বাবার বাড়ির আগাছা আর শ্বশুড়বাড়ির পরগাছা।' এটাই বোধহয় আমাদের সমাজের রুঢ় নিয়ম। বিকৃতরুচির এই অদ্ভুদ নিয়মানুসারে একটা সময় আগাছাকে উপড়ে ছুড়ে ফেলা হয় নতুন পরিবেশে। তারপর শুরু হয় নতুন পরিবারে পরগাছার অভিযোজন করার নিদারুণ চেষ্টা। মেয়ে হয়ে জন্মানোই যেন আমৃত্যু পাপ।"
জানালার গ্রিল ধরে ভাবনার আকাশে ডুবে গিয়েছিলাম। হঠাৎ দক্ষিণের এক পশলা বাতাসে ভাবনার ঘোর কাটলো। ততক্ষণে চোখের তটভূমিতে মেঘ করেছে। মনের চাপাকষ্টে ভেদ করে যেকোন সময় নামতে পারে অশ্রুবৃষ্টি...!
.
আমি মৌমিতা আক্তার মৌনতা। দশম শ্রেণির মানবিক বিভাগের ছাত্রী। বাবা-মার বড় মেয়ে, তবে বড় বলে যে খুব আদরের তা কিন্তু নয়। মায়ের গর্ভে আসার আগ থেকেই বাবার ডিসিশন ফিক্সড, বংশের মুখ রক্ষার্থে তার ছেলে চাইই চাই।
কিন্তু প্রথম সন্তান মেয়ে হওয়াই বাবা মেনে নিতে পারে নি। অথচ ছেলে বা মেয়ে যাইহোক এর সম্পূর্ণ দায়ভার কিন্তু বাবার, বিংশ শতাব্দীতে এসেও আমাদের সমাজ এসব এখনও বুঝে না। সম্পূর্ণ দোষ মায়েদের উপর বর্তায়। দ্বিতীর সন্তান যখন আবার মেয়ে হল, বাবা ক্রোধে ভেঙে পড়লেন। প্রথম সপ্তাহে সন্তান পর্যন্ত মুখ দর্শন করলেন না। নানু বাড়ি থেকে এ বাড়িতে নিয়ে আসলেও বাবার অবহেলা, অযত্নে বড় হতে লাগলাম। পর পর দুটো মেয়ে হওয়ায় আমাদের প্রতি বাবার বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। বাবাকে ভীষণ ভয় পেতাম। তিনি সবসময় ধমকের উপর রাখতেন।
পুত্র সন্তানের আশায় তৃতীয়বারের মত মা আবার বাবু নিলেন, সবার একটাই চাওয়া যেন একটা ভাই হয়। এইবার ভাই ঠিকই হল, কিন্তু সৃষ্টিকর্তা বোধহয় আরেকটু পরিক্ষা করলেন। মা মৃত সন্তানের জন্ম দিলেন। এর পেছনের কারণটা অবশ্য বাবাই। তিনি মাঝেমধ্যেই মায়ের গায়ে হাত তুলতেন।
এরপর চতুর্থবারে আমাদের ভাইটার জন্ম হল। ছোট ভাইটা হবার পর বাবার উৎসাহ আর ধরে না। বাবা দিনরাত ছোট ভাইটাকে আদর করে। এরুপ আদর দেখে আমার ছোট্ট মনে হিংসে হত। যদি আমাকে একটু আদর করতো....
.
মধ্যবিত্তের ঘরে জন্ম বিধায় অভাবকে সচক্ষে দেখতে দেখতে বড় হয়েছি। একটা ডিমের তিন ভাগ হত। অনেকটা মিনা রাজুর কার্টুনের মত। পুরো ডিমের অর্ধেকটা যেত রাজুর পাতে। আর আমাদের দুজনের পাতে অর্ধেকের অর্ধেক অর্থ্যাৎ এক চতুর্থাংশ। বাবা যখন বাহিরে থেকে কিছু নিয়ে আসতেন তখন ছোট ভাইটার পছন্দের প্রাধান্য থাকতো। খাবারের ক্ষেত্রে আমরা পেতাম তার খাবারের ঝুট। বুদ্ধি হবার পর থেকে এ নিয়ে আর আপসোস করতাম না। ভাবতাম, মেয়েদের ভাগটা কম হবে এটাই নিয়ম।
আমাদের দু'বোনের পড়াশোনা নিয়ে বাবার ঘোর আপত্তি থাকলেও মায়ের সাপোর্টে চোখভরা স্বপ্ন নিয়ে এগোতে থাকলাম। কিন্তু বাস্তবতার বাঁধা মাড়িয়ে আর কতক্ষণ, কিন্তু হঠাৎ থমকে গেল সবকিছু... ।
.
মাধ্যমিকের গণ্ডি না পেরুতেই বাবা-মা শৃঙ্খলার বাঁধনে বেঁধে দিলেন। মধ্যবিত্তের ঘরে জন্মে বাবার হোটেলে রয়েবসে খাওয়ার বিলাসিতা আমার কপালে জুটলো না। পড়াশোনা সিকেয় তুলে অনিচ্ছাসত্ত্বেও বিয়ে নামক বন্ধনে আবদ্ধ হতে হলাম। একরাশি স্বপ্নের অকাল মৃত্যুতে যখন দিশেহারা মন, বাসররাতেই স্বামী ঝাপিয়ে পড়লো পাষাণের মতন। একটু মানিয়ে নেয়ার সময়ও পেলাম না। 'কখনই স্বামীর অবাধ্য হওয়া যাবে না। দাঁতে দাঁত লাগিয়ে পড়ে থাকতে হবে।' মায়ের দেয়া মন্ত্রবলে মেনে নিলাম, নিজ স্বামী তো!
চোখ বুজে কাঁদলাম, মুখে বুজে সহ্য করলাম।
একদিন না পেরোতেই শ্বাশুড়ী রান্না ঘর থেকে ছুটি নিয়ে নিলেন। সংসার সামলানোর দায়িত্ব এসে পড়লো আমার কাঁধে। আমি ছোট্ট মানুষ কিভাবে কি করবো গুছিয়ে উঠবো ভেবে পাই না। শ্বাশুড়ীর কাছে কোনকিছু জানতে চাইলে তার দায়সারা জবাব। এভাবে দিন গড়ায়, মাস গড়ায়। আশায় ঘর বাঁধি যদি একটু সুখ মিলে....।
.
বিয়ের সময় আমার মাকে শ্বাশুড়ী আম্মা কথা দিয়েছিলেন, 'আপনার মেয়েকে নিজের মেয়ের মত করে রাখবো।' কিন্তু শ্বাশুড়ী আম্মা তার কথা রাখেন নি, বরং এই বাড়ির পুরোদস্তুর কাজের মেয়ে বানিয়ে রেখেছেন। এসব নিয়ে আমার অভিযোগ নেই। কিন্তু তার তো আমার প্রতি অভিযোগের শেষ নেই.....।
.
একদিন খাবার টেবিলে শ্বাশুড়ী আম্মা আমাকে উদ্দেশ্য করে সবার সামনে বললেন,
-আমার একটা মাত্র ছেলে। কত আশা করে বিয়ে দিলাম। অথচ শ্বশুরবাড়ি থেকে একটা সুচও দিল না। পাশের বাড়ির মিনহাজের শ্বশুর গাড়িভর্তি জিনিস পাঠিয়েছে। আর আমার ছেলের কপালডাই পুড়া।
=মা তুমি থামো তো। এসব কি বলো? আমার কি অভাব পড়ছে যে যৌতুক নিতে হবে?
-আমি তো তোর ভালোর জন্যই বলছি। তোর তো একটা ভবিষ্যৎ আছে। ছেলেপিলে হবে তখন তো দরকার হবে।
=এখন এসব কথা বাদ দাও। ভবিষ্যতের ভাবনা পরে।
-আমি তো বললেই দোষ। আমি কি কবরে বাইন্ধা নিয়া যাবো?
=মা, চুপ করো। সময় হোক, পরে দেখা যাবে। মৌমিতা তুমি খেয়ে নাও। মায়ের কথায় কিছু মনে করো না।
আমার চোখ পানি ভাতের থালায় পড়ছে। চুপ করে বসে কথা হজম না করে খাবার ছেড়ে উঠে গেলাম। ঘরের জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছি। চোখ বেয়ে নেমেছে শ্রাবণের বর্ষা।
মনে মনে ভাবছিলাম, পৃথিবীর সব মায়েরা এমন স্বার্থপর কেন? এক মা মেয়েকে বিদেয় করলে বাঁচে, আবার কেউ বউমাকে জব্দ করে নাচে। এক মা নিজ সন্তানের সুখের জন্য আরেক মায়ের সন্তানকে কষ্ট দেয় কেন?
মাঝে মাঝে মনে হয় মেয়েদের বিয়ে হয় অন্যের বাসায় কাজ করার জন্যই, শ্বশুড়বাড়িতে তার একটাই পরিচয় সে কাজ করার জন্য এ বাড়িতে এসেছে। অথচ ইসলাম মেয়েদের এত বোঝা চাপিয়ে দেয়নি যতটা এই সমাজ চাপিয়ে দিয়েছে!
সত্যিই বাস্তবতার সমীকরণ মেলানো বড্ড কঠিন.....।
.
প্রতিটা মেয়ের মত আমিও স্বপ্ন দেখতাম, আমার স্বামী আমার সুখদুঃখ বুজবে। আমার চাওয়া পাওয়াগুলো পূরণ করবে। কিন্তু স্বামী আমার ভীষণ রকমের মাতৃভক্ত। মা যা বলবে তাই, আর পৃথিবীর অন্য সবকিছু ভুল। বাছবিচারহীন অন্ধ লেভেলের ভক্ত বলা যায়। তবে আমায় যথেষ্ট ভালবাসে। বাসর রাতের মত দ্বিতীয়বার জোর করে নি। আমার সব আবদার শুনে, তারপর মায়ের সংসদে বিল পাশ হলেই আমার চাহিদাগুলো বাস্তবে রুপ নেয়। মনের মধ্যে বিদ্রোহ করতো, কিন্তু মায়ের মত মুখবুজে সহ্য করে নিয়েছিলাম।
.
প্রতিবার যখন মায়ের বাড়ি থেকে শ্বশুরালয়ে ফিরি, তখন শ্বাশুড়ী আম্মা ব্যাগ চেক করেন কি কি নিয়ে এসেছি। অভাবের সংসার তবুও মা এক বস্তা জিনিস বেঁধে দেন। এটা সেটা কত কি? মায়ের প্রতি তখন রাগ হয়, পৃথিবীর সব মা কেন আপন মায়ের মত হয় না?
শ্বাশুড়ী আম্মা ব্যাগ খুলে একে একে সব বের করবেন। শাকসবজি, ফলমূল, খাবার আলাদা করবেন। আবার নিয়ম করে বলবেন, 'এসব কেনো আনো? এই কয়টা জিনিস আমি কয়জনের মুখে দেব? এসব ন্যাকামো না করলেও পারতে।'
মনটা তখন ভীষণ খারাপ হয়ে যেত। শ্বশুরবাড়িতে নিজের বাবারবাড়িকে বড় দেখাতে কোনো মেয়ে পিছপা হয় না। আর শ্বশুরবাড়ির মন রক্ষার জন্য বাপের বাড়ি থেকে অনেক কিছু নিতে চায়, এর জন্য বাপের বাড়িতে কখনও কখনও ছ্যাঁচড়া বা লোভী হতে হয়। তবুও কারো কাছে এসবের মুল্য দেয় নেই।
.
মৌ আমার একমাত্র ননদ। কলেজে পড়ে। রুপে গুণে মাশাল্লাহ্। উচ্চাভিলাসী, অহংকারীও বটে। আমার সাথে বেশ বন্ধুবৎসল, তবে মাঝেমধ্যে শ্বাশুড়ী আম্মার মত দ্বিমুখী আচরণ করে। একই রসুন থেকে তো আর ভিন্ন গাছ হয় না। তাই হিসেব করে কথা বলতে হয়। একদিন মৌ আমার কাছে গল্প করতে আসে।
-'ভাবী, তুমি কি ফ্রি আছো?'
='হ্যা। কিছু বলবে??'
-'না! এমনিতেই মন খারাপ লাগছিল। তাই ভাবলাম তোমার সাথে গল্প করি।'
='তা আমার ননদিনীর কি নিয়ে মন খারাপ?'
-'আজ ফাহিমের সাথে ব্রেক আপ করে দিছি।'
='ওমা। কেন??'
-'আর বলো না। দেখতে তো একেবারে খ্যাত মার্কা। ভাল কবিতাটা টবিতা লিখতো। তাই ওকে ভাল লাগতো। কিন্তু কবিতা দিয়ে তো জীবন চলে না। দু পয়সা খরচ করার মুরোদ নেই, সে আবার প্রেম করতে আসছে'
বুঝতে পারলাম, ছেলেটার কবিতা লেখার অসামান্য প্রতিভা আছে। মৌ এই কবিতার প্রেমেই পড়েছিল কিভাবে এটা বোধগম্য হচ্ছে না। যাইহোক প্রেমের বাজারে কবিতাপ্রীতি আর কতক্ষণ! বাস্তবতার কাছে যেখানে আবেগ শুন্য, সেখানে ভালবাসা নিশাদলের মত উবে যায়। তবে আমার কাছে মনে হয়, সত্যিকারের ভালবাসার কাছে রুঢ় বাস্তবতাও হার মানে।
='ভাল করেছো। কত দিনের সম্পর্ক ছিল?'
-'এইতো এগার মাস মতো।'
='একজন গেছে আরেকজন আসবে। এই নিয়ে আবার মন খারাপ করার কি আছে শুনি?'
='কলেজের ক্রাশ আবির ভাইয়া প্রপোজ করছে। হ্যাঁ, না কিছুই বলি নি। শিল্পপতির সুদর্শন ছেলে। কলেজের মেয়েরা তার জন্য পাগল। মোটরবাইক নিয়ে কলেজে আসে। দেখলেই মনে হয় সিনেমার নায়ক।'
='তাহলে হ্যাঁ বলেই দাও।'
ব্যাক আপ থাকায় ব্রেক হয়েছে। এবার ফাহিমের বিষয়টা পরিস্কার হল। রুপের মোহ আর টাকার কাছে কবির প্রেম ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। মনে মনে ভাবলাম, দুইদিক দিয়ে ভাল হয়েছে, কবিবর কষ্ট পেলেও তার লেখণির ধার শানিত হবে, আর এমন স্বার্থপর মেয়ের হাত থেকে বেঁচে গেছে।
-'হ্যাঁ বলি নি। তবে গ্রীণ সিগন্যাল দিয়েছি। এদিকে আবার বাসা থেকে মুনতাসির ভাইয়াকে পছন্দ করে রেখেছে।'
='তোমার পছন্দের উপর কেউ কিছু বলে নাকি? তোমার যেটা পছন্দ সেইটা করবে।'
মুনতাসির গৃহশিক্ষক। ছেলে যথেষ্ট ভাল। মাস্টার্স পড়তেছে এবং চাকরির চেষ্টা করছে। তিনবছর ধরে মৌ'কে পড়ায়। এই বাসার একজন সদস্য হয়ে গেছে বলা যায়। সবার পছন্দের পাত্র। বাসা থেকে তার প্রতি গ্রীন সিগন্যাল আছে।
সবমিলিয়ে বুঝলাম মৌ তিনটা জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে।
.
ইফতারির পর বাড়ির বউ বাদে সবাই দুর্বল হয়ে পড়বে, এটাই আমাদের সমাজের নিয়ম। কারণ বাড়ির কাজের মেয়েটার কোন কোন বিশ্রাম নেই। এরা রোবটের মত কাজ করে। অথচ শ্বাশুড়ী সিরিয়াল দেখবে, ননদ ফোনে মুখ লুকাবে, স্বামীও শয্যাশায়ী হবে। সারাদিনও এর ব্যতিক্রম নয়। গল্প আড্ডায় সবাই যখন মেতে উঠে, তখন আমায় থাকতে রান্নাঘরের আস্তিনে। একা একা এত্তগুলো রান্না করতে করতে জীবনডা মরিচ বাটার মত পিষে যায়। এই কষ্টটা শুধু তারাই বুঝে যারা রান্না করে কাজ করে। একবার ননদিনী বললাম, রান্নার কাজে আমায় তো একটু হেল্প করতেই পারো, তখন শ্বাশুড়ীর কাছে রিপোর্ট চলে গেল। আমি নাকি তাকে রান্নার জন্য বলছি। শ্বশুরবাড়ির পরিবেশটাই অদ্ভুদ, কোনকিছুতেই কারো মন ভরানো যায় না। এখানে বাকস্বাধীনতাহীন পরাশ্রয়ী প্রাণীর মত চলতে বাধ্য করা হয়।
.
দুবছর পরের ঘটনা। মৌ আবিরের সাথে দুবছর সংসার করে বাবার বাসায় ফিরে এসেছে। তাদের ডিভোর্স হয়ে গেছে। আগের সেই উচ্চাভিলাসী মনোভাব, রুপের অহংকার আর নেই। রান্না ঘরে আর ডাকা লাগে না। নিজ থেকেই এসে রান্নাবান্নায় হেল্প করে। কারণ, সে বুঝতে পারে, সেও এ বাড়ির আগাছা।।
.
একটা আগাছা ও পরগাছার গল্প
লিখায়-বাঁধন আহমেদ
You must be logged in to post a comment.