Top: নীলাভ্র আর নীলাম্বরীর গল্প

একজনকে চিনি যে রোজ আফসোস নিয়ে ঘুমাতে যায়। বিলাসবহুল ফ্লাট, ছয় অঙ্কের মাইনে এবং আয়নার ওপর পাশে ভীষণ সুদর্শন চেহারা তাকে সুখী করতে পারে নি। তার ফেসবুকেওয়াল ঘুরলে দেখবেন, সুন্দরী তরুণীর হাতে হাত রেখে ছবি আপলোড করছে।।তারা ঘুরতে যায় সমুদ্র সৈকতে কখনও পাহাড় দেখতে৷ তাদের টাইমলাইনে, ব্যক্তিগত জীবনে মাখামাখি প্রেম চলে। বছরখানেকের মধ্যে শুভদিন দেখে বিয়ে করবে বলেও শুনছি। দুই পরিবার রাজি তবু ছেলেটা বিয়ের তারিখ পিছায়। জবাবদিহিতারস্বরে মেয়েটাকে বলে,
-বিয়ে করলেই রোমান্টিজম কেটে যাবে।এইতো বেশ আছি, খাচ্ছি-দাচ্ছি ঘুরে বেড়াচ্ছি।
খুব বেশি রাগারাগি করলে মান ভাঙানোর উপহারস্বরুপ মেয়েটির অনামিকায় শোভা পায় ডায়মন্ডের রিং,গলায় বাইশ ক্যারেটের নেকলেস। এত ভালোবাসা পেয়ে মেয়েটা কৃতার্থ হয়। তাকে ফাল্গুন আর পহেলা বৈশাখের অপেক্ষায় থাকতে হয় না। তার বয়ফ্রেন্ড নিতান্তই সাধারণ একটা দিনকে তারজন্যে ভালোবাসা দিবস বানিয়ে দেয়। কয়েকঘণ্টা ভিডিওকলে খুনসুটির পর সে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে যায়।ছেলেটা ঘুমাতে পারে না। বেনসনের প্যাকেট হাতে নিয়ে বেলকনিতে এসে দাঁড়ায়। লম্বা সুখটানের পর সিগারেটের ধোঁয়ায় একটা নারীর মুখ স্পষ্ট হয়। আশ্চর্য! মেয়েটির অবয়ব তার সো কলড গার্লফ্রেন্ডের মত নয়। স্ট্রেইট করা সোনালী চুলের পরিবর্তে রুক্ষ কোঁকড়া কালো চুল, পালিশ করা ঝকঝকে রঙের তুলনায় মেটে রঙা সাধারণ কোনো মেয়ে। সুতি ওড়নায় শরীর ঢেকে সেই মেয়েটা ক্লাসে আসত আর ছেলেটা পাশের বেঞ্চে বসে আড়চোখে তাকিয়ে থাকত। মুঠোফোনে টুকিটাকি ক্ষুদেবার্তা আদানপ্রদান হত। মেয়েটির ফোন ছিল না, মায়ের ফোন থেকে লুকিয়ে এক টুকরো মেসেজ,
-কেমন আছ?
ছেলেটা সেই মেসেজ দিনে কয়েক হাজার বার পড়ত।
তবু মন ভরত না।
-কাল লাল সালোয়ার-কামিজ পরে এসো।
মেয়েটির লাল জামা নেই। শুধুই ছেলেটির মন রাখতে খোপায় শোভা পায় রক্তজবা ফুল। ইশ!পাশের সারিতে বসা একজন খোপার উপর থেকে নজর সরাতে পারে না। ছেলেটা কখনও কারো কাছে বলতে পারবে না, কলেজ লাইফে তার একজন ছিল। যার স্পর্শে শরীরে শিহরণ জাগে নি, যার হাতে হাত রেখে মাইলের পর মাইল রিকশায় ছুটে চলা হয় নি তাকে প্রেমিকা বলা যায়,? যায়। বিপরীত লিঙ্গের একজনের নাম উচ্চারণ করামাত্র আপনার বুকের ভেতর রক্ত ছলাৎ করে উঠে,জিহ্বাতে শিরশিরে অনুভূতি আর প্রাণে উদ্দাম হাওয়া বইতে শুরু করে এই ব্যাপারটাকে প্রেম বলে এবং সেই প্রেমের আগে পবিত্র কথাটা যুক্ত হয়। তাকে বিবস্ত্র করিয়ে দৈহিক চাহিদা মেটাবেন, সে আপনার সুখেদুঃখের সঙ্গিনী হবে তারওচেয়ে বড় কথা আপনি সকালটা তার মুখ দেখে শুরু করতে উৎসুক। এই যখন আপনার নিতান্ত চাওয়া তখন তাকে ভালোবাসা বলে।
বলছিলাম ছেলেটার কথা যে কী না সাত বছর আগের হারিয়ে যাওয়া কলেজ লাইফের দিনগুলোকে মিস করে। তার স্মৃতিতে একটা মেয়েই ঘুরে ফিরে আসে, যাকে কখনও বলা হয় নি ভালোবাসি অথচ তারওচেয়ে বেশি ভালোবাসা আর কাউকে বাসতেও পারে নি।সেই উনিশ-কুড়ি বয়সে প্রেমিকাকে সঙ্গী করে নিলে হয়ত মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে ঝা তকতকে চাকুরি হত না, আইফোন, দামী বাড়ি-গাড়ি স্বপ্নেই থেকে যেত। কিন্তু প্রতিরাতে ঘুমাতে যাবার আগে ছেলেটির দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলতে হত না,
-মেয়ে, তুমি আর আমার স্বপ্নে এসো না।
এবার যার গল্পটা বলতে হয় তার বিয়ের সময় মোহরানা ছিল পঁচিশ লাখ। পাত্রপক্ষ অর্ধেকটা গয়নায় উসুল করেছিলেন বাকিটা ফিক্সড ডিপোজিট৷ আইনজীবী বাবার কন্যা হিসাবে ভুল করে নাই ভালোবাসার রিপ্রেজেন্টিভ প্রেমিকটাকে ছেড়ে বিয়ে করে নিয়েছে উচ্চপদস্থ আমলা। বরের সাথে ব্যাংকক, বালি হলিডে উৎযাপনের সময় রঙবেরঙের ছবি আপলোড হয়।আলমিরা ভর্তি কাঞ্জিভরম, সাউথ কাতানের বাহার দেখে আপনি মেয়েটিকে সুখী ভাবতে পারেন।পুত্র সন্তানের চার বছর চলে কিন্তু স্বামীর আজ অবধি ঝগড়া হয় নি। অবিশ্বাস্য শোনালেও সত্যি এই মেয়েটি প্রেমিকের ঠোঁটে ফাইভ ফাইভ সিগারেট দেখে চোখের জলে বালিশ ভেজাত অথচ স্বামী হুইস্কির বোতল খুলে বসলে চুপচাপ চেয়ে দেখে। একজন মানুষের ব্যাক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে নিজেকে কেমন হ্যঙলা দেখায়৷ কে বলে, একদিন এই মেয়েটি একদিন যুদ্ধ করে অপর প্রান্তের মানুষটার ফেসবুক পাসওয়ার্ড উদ্ধার করত। পাশের বালিশে শোওয়া মানুষটার সাথে ওর সমঝোতা ভালো, স্ত্রী হিসেবে ও বিশ্বাসযোগ্যও বটে। শুধু শরীরের উপর আরেকখানা লোমশ হাত ওর অনুভূতি জাগায় না।
প্রথম প্রেম, দ্বিতীয় প্রেম বলে কিছু নেই৷রুপবতী প্রেমিকা, স্মার্ট বর এইসব কিছু শো অফের চেয়ে বেশি জরুরি আপনি কতটা ভালো আছেন, কাকে নিয়ে ভালো আছেন তা জানতে চাই নি।এক জীবনে আপনার সমস্ত আকাঙ্খা পূর্ণ হবে এইরকম ভাবার কোনো কারণ নেই। রেললাইনের মত সমান্তরালে খানিকটা দূরত্ব রেখে জীবন কাটানোর চেয়ে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে মরে গেলে তাতেও স্বর্গীয় সুখ। জীবন আপনার, আপনাকেই বেছে নিতে হবে কোনটা চান। প্রিয়জন নাকি প্রয়োজন?
হাবিবা সরকার হিলা
188188
 
7 comments
7 shares
 
Like
 
 
 
Comment
 
 
Share
 
 

Enjoyed this article? Stay informed by joining our newsletter!

Comments

You must be logged in to post a comment.