Top: নীলাভ্র আর নীলাম্বরীর গল্প

ঘর্মাক্ত শরীরে একটু পরেই নেতিয়ে পড়লো আব্বাস। এখন তার দু চোখ ভর করে নামবে রাজ্যের ঘুম। সারাদিন পরিশ্রমের পর এইটুকু সময় ঘুমাতে তার বেশ লাগে। পাশেই ছটফট করছে সখিনা। আজও সুখ টা পেতে পেতে সে পেলো না। প্রায় রাতেই তার এমন হয়। কিছু বলতেও পারে না আব্বাসকে। একবার বলেছিলো সে আব্বাসকে যে সে ঠিকমতো তৃপ্তি পাচ্ছে না। বিনিময়ে সে শুনেছিলো,
" মাগী, তর শরীলে এতো আগুন ক্যান? কয়ডা ব্যাডা লাগে তর? চুপ যা, কইলাম। আর কোন কতা কবি না।"
সখিনা চুপ করে যায়। কী বলবে সে আর! হয়তো তারই সমস্যা। তা না হলে তার এমন লাগে কেনো। ইশ! কী সুন্দর করে তার পুরুষ মানুষটা কাটা কলা গাছের মতো তৃপ্তি নিয়ে ঘুমাচ্ছে। কিন্তু তার চোখে ঘুম কই!
একদিন জমিতে শাক তোলার সময় পাশের বাড়ির টুনির মার সাথে কথা হয়। আসমা ভাবি। তারই সমবয়সী। কথায় কথায় আসমা ভাবি বলেন,
"আমার টা তো আমারে বেজায় সুখ দেয়। টাকা পয়সা কম কামায় ঠিক আছে। কিন্ত শরীর ও মন দিয়া তা শোধ করে দেয়।"
এ শুনে সখিনা আব্বাসকে নিয়ে কল্পনার আকাশে উড়ে বেড়ায় কিছুক্ষণ৷ যেখানে বলশালী আব্বাস তাকে বুকে জড়িয়ে একেবারে পিষে সখিনার আশা আকাঙ্ক্ষা গুলো পূর্ণ করে। তাকে এনে দেয় জগতের পরম সুখ। আহ! কী শান্তি!
সখিনা ভাবে আজ রাতে আব্বাসকে আবার তার অতৃপ্তির কথা বলবে। প্রয়োজনে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে বলবে। বাড়ি এসে ঝটপট দুপুরের রান্না করে ফেলে সে। পুঁই শাক দিয়ে আলুর চচ্চড়ি আর সিলভার কার্প মাছের ভুনা। সাথে সাদা ভাত। আর একটা কথা ভাবে সখিনা। শারীরিক সুখ না থাকলেও ভাত কাপড়ের অভাব রাখে নি আব্বাস।
আব্বাস আজ দুপুরে জলদি আসবে বলেছে। এখনো আসছে না। সখিনা আঙিনার শেষ মাথায় গিয়ে আব্বাসের জন্য অপেক্ষা করছে। দূর থেকে আব্বাসের হাঁটার ঢং দেখেই সখিনা আব্বাসকে চিনতে পারে। সে চিন্তা করছে আজ রাতেই বলবে কিনা কথাটা।
বাড়ি এসেই আব্বাস সখিনাকে এক নজর দেখে। তারপর চোখের ইশারায় সখিনাকে ঘরের মধ্যে যেতে বলে। পাশেই সখিনার শ্বাশুড়ি মাটির চুলা থেকে ছাই বের করছিলেন। সখিনা শ্বাশুড়ির চোখ এড়িয়ে ঘরে প্রবেশ করে। দ্রুত দরজার ছিটকিনি টা লাগিয়ে দেয়। আব্বাসকে খুব খোশমেজাজে দেখা যাচ্ছে আজ। ঘটনা কী?
" বউ, তরে আজ রাইতে বেজায় শান্তি দিমু। প্রস্তুতি নিয়া রাখিস। এই আব্বাস এখন থেইক্যা তর কাছে হইবো হিরো আব্বাস।" বলেই পান খাওয়া কালো দাঁত গুলো বের করে দুষ্টুমি মাখা হাসি উপহার দেয় সখিনাকে। সখিনাও লজ্জাবনত মুখে ফিরতি হাসি দেয়।
হঠাৎই সখিনা তার শ্বাশুড়ির হাক শুনে বাইরে বেরিয়ে আসে।
" ও বউ চউক্ষের মাথা খাইছো নি? লাজ শরম নাই নাকি? দুপুর বেলাত ঘরের ছিটকিনি লাগাইয়া সোয়ামীর সাথে গপ করতাছো? আব্বাসরে খাইতে দিতে হইবো না? গপ সপের লেইগ্যা তো সারা রাইত পইরা আছে। "
সখিনা মাথা নিচু করে কিছু না বলে চলে যায়। কিন্তু তার মনের মধ্যে চলছে খুশির জোয়ার। আব্বাস সত্যিই তাকে পরম সুখ দিতে পারবে? খুশিতে খুশিতে সে আব্বাসকে ভাত খেতে ডাকে। আব্বাসও আজ পরম তৃপ্তির সাথে গলধঃকরণ করে ধোঁয়া উঠা সাদা ভাত। তারপর আব্বাস চলে যায় শহরে তার দোকানের কিছু মালপত্র আনতে। তারও মেজাজ কেমন ফুরফুরে লাগছে।
সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত ঘনিয়ে এসেছে। ইলেক্ট্রিসিটি নেই। খানিক আগেই চলে গিয়েছে। একটা ছোট চার্জার ধরিয়ে সখিনা অপেক্ষা করছে আব্বাসের জন্য। সম্ভবত ঘন্টা খানিক পার হয়েছে। আব্বাসের আসার নাম নেই। কই, কখনো তো এতো দেরি করে না সে? কী হলো তবে আজ? সখিনার মন আনচান শুরু করে।
হঠাৎই সখিনা বাইরে শুনতে পায় শোরগোল। হৈ হৈ রৈ রৈ। সখিনার শ্বাশুড়ি বলা শুরু করলেন,
"কি রে বউ, বাইরে কী হইছে? আব্বাস অহনো আসে না ক্যান? অ বউ, হুনছস নি কিছু?"
সখিনা কোন কথা না বলে দ্রুত পায়ে এগিয়ে যায় বাহিরের দিকে। কেনো জানি তার বুক ধুকপুক করছে। নিজের হৃদকম্প মনে হচ্ছে সে নিজেই শুনতে পাচ্ছে। অনেক লোক এর শব্দ শোনা যাচ্ছে। পূর্নিমার আলোয় সে দেখতে পায় লোকগুলো কাউকে পাঁজাকোলা করে তার বাড়ির দিকেই এগিয়ে আসছে।
অবশেষে সখিনার প্রতীক্ষার প্রহর শেষ হয়। ইলেকট্রিসিটি চলে এসেছে। আব্বাস বাড়ি ফিরেছে। তবে ফিরেছে সে লাশ হয়ে। আজ বাড়ি ফেরার পথে একটা ট্রাক তাকে চাপা দিয়ে গেছে। সারা শরীর রক্তে মাখামাখি। কিছুক্ষণ বেঁচে ছিলো সে। হাসপাতালে নেবার পথই সব শেষ হয়ে যায়। উঠোনে এখন পড়ে আছে আব্বাসের নিথর দেহ। সখিনা একেবারে স্তব্ধ হয়ে বসে আছে আব্বাসের মাথার কাছে। কথা বলতে বা কান্না করতেও সে ভুলে গেছে। সখিনার শ্বাশুড়ি তারস্বরে চিৎকার করছে।
সখিনা শুষ্ক মুখে চারদিকে তাকায়। এক বুক হাহাকার আর শূন্যতা তাকে ঘিরে আছে। যে সুখের প্রতীক্ষায় সে এতোদিন ছিলো তা আজ তার কাছে খুব তুচ্ছ বোধ হচ্ছে। হঠাৎ করেই কান্নায় ভেঙে পড়ে সখিনা।
অনুগল্পঃ সুখের আশায়
লেখাঃ নুসরাত_জান্নাত

Enjoyed this article? Stay informed by joining our newsletter!

Comments

You must be logged in to post a comment.