Top: নীলাভ্র আর নীলাম্বরীর গল্প

অর্থি আর আমার সম্পর্কটা ঠিক স্বামী-স্ত্রীর মতো না। বাইরে আমরা ঠিকই সুখী দম্পতির অভিনয় করি। কিন্তু ভেতরে আমরা একদম আলাদা। আমরা আলাদা ঘরে থাকি, আলাদা খাটে শুই। আলাদা সময়ে খাই। আলাদা সময়ে টিভি দেখি। মোট কথা, আমাদের সম্পর্কটা স্বামী-স্ত্রীর না হয়ে ঠিক অনেকটা ফ্ল্যাটমেটের মতো।
আমাদের সম্পর্কটা শুরু হয়েছিলো ঠিক একবছর আগে। পরিবারের সবাই আমাকে নিয়ে গেছে পাত্রী দেখতে। আমি পুরো বিরক্ত। বিয়ে করার কোনো ইচ্ছাই নেই আমার। তবুও সবার জোরাজুরিতে যেতে হয়েছে।
পাত্রী এসেছে আমাদের সামনে। দেখি, পাত্রী আমার থেকেও বেশি বিরক্ত।‌ সে গম্ভীর মুখে বসে থাকে, বিরক্তি নিয়ে সবার প্রশ্নের উত্তর দেয়। দেখা-টেখা শেষে যখন নিজের ঘরে যেতে বলা হলো, তখন যেন খুশিতে লাফাতে লাফাতেই নিজের ঘরে চলে যায়। ওর যে বিয়ে করার ইচ্ছা নেই, এটা তো এক দেখাতেই বোঝা যায়। কিন্তু সমস্যা হলো আম্মাকে নিয়ে। তার পাত্রী খুব পছন্দ হয়ে গেছে। তিনি আমাকে বললেন, 'যা, পাত্রীর সাথে আলাদা একটু আলাপ করে আয়।'
আমি বলি, 'কি দরকার?'
'কি দরকার মানে? যেতে বলছি, যাবি। তোর কথা শুনেই দেখবি মেয়েটার মন চেঞ্জ হয়ে যাবে।'
ধুর, কি ঝামেলা। গেলাম পাত্রীর রুমে, অবশ্যই ওদের পরিবারের অনুমতি নিয়ে। পাত্রী আমাকে দেখেই বললো, 'আপনার সাথে আমার গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।'
'বলেন।'
'আমার একটা রিলেশনশিপ আছে।'
'আচ্ছা।'
'খুব ইনটিমেট রিলেশন।'
'আচ্ছা।'
'আমি কনসিভও করেছি।'
'আচ্ছা।'
মেয়েটা ভ্রু কুঁচকে বললো, 'আপনি শুধু আচ্ছা আচ্ছা করছেন কেন?'
'আর কি করবো? আপনার বিয়ে করার ইচ্ছে নেই তো? খুবই ভালো। আমিও আপনাকে বিয়ে করবো না।'
'কেন?'
'কেন মানে? আপনার না রিলেশনশিপ আছে?'
'শুধু সেটাই কারণ?'
'না।'
'তাহলে? আরো কারণ আছে?'
'আছে।'
'কি?'
'আপনাকে বলবো‌ না।'
মেয়েটা দেখলাম বেশ গম্ভীর হয়ে গেল। আমি আর কোনো কথা না বলে বাইরে চলে আসলাম।
বাড়ি এসে মা জিজ্ঞেস করলেন, 'মেয়ে কেমন দেখলি?'
'ভালো না। একদম বাজে।'
মা রেগে গিয়ে বললেন, 'এখন পর্যন্ত যতো মেয়ে দেখছিস, সবার বেলায় একই কথা। তোর বিয়ে করার ইচ্ছা নাই?'
'না।'
'যা ইচ্ছা করগে, যা।'
মা রেগে টঙ হয়ে রইলেন। মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেলো। প্রতিবার মেয়ে দেখতে গেলেই এমন ঝামেলা হয়। ধুর, এরপর মরে গেলেও পাত্রী দেখতে যাবো না।
রাতে খাওয়ার পর নিজের রুমে এসেছি, এসময়ই অচেনা নাম্বার থেকে কল আসলো। ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে বললো, 'অর্থি বলছি।'
'অর্থি কে?'
'আরে, আজকে যাকে দেখতে আসছিলেন।'
'ওহ আচ্ছা। বলেন।'
'আপনি আমাকে বিয়ে করতে চান না কেন?'
'বলেছি না, বলতে পারবো‌ না।'
'বিয়ে কি কেবল আমাকেই করতে চান না?'
'না, কাউকেই করতে চাই না।'
'মেয়ে জাতির প্রতি বীতশ্রদ্ধ?'
'অনেকটা।'
'ভেরি গুড। আপনাকে একটা অফার দিতে চাই।'
'কি অফার?'
'আপনাকে আমি বিয়ে করবো। কিন্তু বিয়েটা হবে জাস্ট ফর্মালিটি, লোক দেখানো। বিয়ের পর আপনি আপনার মতো‌ থাকবেন, আমি আমার মতো।'
'এসব কি বলেন? আপনি কি পাগল?'
'বুঝতে পারছি, আপনাকে বিষয়টা বুঝাতে পারি নাই। কালকে শ্যামলি স্কয়ারের 'লা ডিন' কফি শপে চলে আসেন না, বিকেলে পাঁচটায়। কফি খেতে খেতে আপনাকে বুঝাবো।'
আমি ফোনটা রেখে দিলাম। পাগলের কথা শুনে লাভ নাই।
পরদিন অফিস গেলাম। সারাদিন অফিস করলাম। তিনটার একটু আগে ছুটি নিয়ে ধানমন্ডি লেকে গেলাম। ওখানে বাদাম খেতে খেতে লেকের পানি দেখলাম। চারটায় বাসে উঠলাম। পাঁচটার মধ্যে বাসায় পৌঁছে যাবো।
কিন্তু আমার বাসায় যাওয়া হলো না। রাস্তায় প্রচুর জ্যাম। গাড়ি পিঁপড়ার গতিতে এগোয়। শেষে শ্যামলি স্কয়ারের সামনে এসে ঠাঁয় বসে থাকে আধা ঘন্টা।
আমি বিরক্ত হয়ে নেমে যাই। মাথা ঝিমঝিম করছে। কফি খাওয়া দরকার। সব কফি দোকান বন্ধ। কেবল 'লা ডিন' খোলা। ওটাতেই ঢুকি। অর্থি না ফর্থি, ওর চিন্তা করে লাভ নাই। ও আসবে না নিশ্চিত।
'লা ডিনে' ঢুকে একটা নিরিবিলি জায়গা দেখে বসে পড়ি। কফির অর্ডার দিবো, এসময় দেখি অর্থি চলে আসছে। আমাকে দেখেই বললো, 'স্যরি, দেরি হয়ে গেল। অর্ডার দিয়ে দিয়েছেন? না দিলে খুবই ভালো। আমি আবার সব কফি খাই না।'
আমার মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল। কি ঝামেলা।
অর্ডার দেয়া হলে অর্থি বললো, 'শোনেন। আপনাকে ব্যাপারটা পরিষ্কার করে দেই। আমার নিজেরও বিয়ে করার ইচ্ছা নাই।'
'বুঝতে পারছি।'
'আমি কালকে যেসব গল্প বলেছি, সেগুলো বানানো।'
'তাও বুঝতে পেরেছি।'
'কিন্তু বাসা থেকে খুব চাপ দিচ্ছে বিয়ের জন্য। আসলে, কালকে আপনারা চলে আসার পর অনেক আজেবাজে কথা শুনতে হয়েছে আমাকে। আমাদের সমাজে বিয়েটাকেই তো লাইফের একমাত্র গোল হিসেবে দেখা হয়। বাবা-মা ছোট বেলায় পড়ানোর সময় বলেন, ভালোমতো পড়ো, নাহলে ভালো জামাই বা বউ পাবা না।'
'আমি বুঝতে পেরেছি আপনার কথা। এখন আসল পয়েন্টে আসেন।'
'আমার আসল পয়েন্ট এই যে, আমরা বিয়ে করি। যেহেতু আমারও বিয়ে করার ইচ্ছা নাই, আর আপনারও নাই, তাই আমরা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে আবদ্ধ হবো না। বিয়েটা হবে লোক দেখানো। আমরা বাইরে স্বামী-স্ত্রীর মতো অভিনয় করবো। ভিতরে ভিতরে নিজেদের মতো থাকবো। আপনি রাজি?'
'না। এটা কোনো বাস্তবসম্মত কথা না। আমরা অভিনয় করবো, আর বাড়ির কেউ ধরতে পারবে না, এটা কি সম্ভব?'
'জ্বি, সম্ভব। কারণ আমরা আলাদা ফ্ল্যাট ভাড়া নিবো।'
'আমি চলি। আপনার প্ল্যান আমার পছন্দ হয় নাই।'
আমি বাসায় চলে আসলাম। দেখি, মা আবার আমার জন্য এক পাত্রী পছন্দ করেছেন, কাল দেখতে যেতে হবে। আমি না বলতেই চিল্লাপাল্লা শুরু করলেন। কি মুসিবত, এই ঝামেলার তো দেখি শেষ নাই। বিয়ে না করা পর্যন্ত এই ঝামেলা যাবে না দেখছি।
আমি রুমে এসে অর্থিকে ফোন দিলাম। আর কোনো উপায় দেখছি না।
পরের শনিবার আমার আর অর্থির মধ্যে নিম্নের শর্তাবলী সমেত এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়-
১. আমরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হবো, কিন্তু সেটা সম্পূর্ণ লোক দেখানো। আমাদের মধ্যে যথাযথ পরিমাণ শারীরিক ও মানসিক দূরত্ব বজায় থাকবে।
২. বাহিরে সবার কাছে নিজেদের সুখী দম্পতি প্রমাণে সর্বদা সচেষ্ট থাকবো।
৩.কেউ কারো ব্যক্তিগত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবো না।
৪. বিয়ের পর নিজেদের সার্বিক ব্যয় নিজেরাই বহন করবো। তবে সংসার চালনায় সম্মিলিত কোনো ব্যয়ের ক্ষেত্রের উদ্ভব হলে, দুজনকে সমানভাবে সেই ব্যয় বহন করতে হবে।
৫. এই শর্তাদির বাইরে অন্য যেকোনো বিষয়ে দু'পক্ষের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।
ব্যস। আমার আর অর্থির বিয়ে হয়ে গেলো।
বিয়ের পর প্রথম সাত-আটদিন একটু সমস্যা হয়েছিলো। আমাকে আর অর্থিকে একই রুমে থাকতে হয়েছিলো। বাসর রাতে ঘরে ঢুকেই যখন দেখলাম, অর্থি বিছানায় বসে আছে, আমি সোজাসুজি বললাম, 'আমি সোফায় শুতে পারবো না।'
'দরকার নাই। আপনি খাটেই শোন। আজকের রাত আমাদের জন্য পরীক্ষার রাত। আমরা চুক্তির শর্তাবলী ঠিকমতো মানতে পারবো কিনা, আজ রাতেই প্রমাণ হবে।'
'খুব ভালো।'
আমি বিছানার মাঝখানে কোলবালিশ, কুশন এগুলো দিয়ে ব্যারিকেডের মতো করে দিলাম। অর্থি বললো, 'কি করেন?'
'বর্ডার বানিয়ে দিলাম। কেউ যেন অন্য কারো জায়গায় অনুপ্রবেশ করতে না পারে।'
সেই রাতে আমাদের খুব ভালো ঘুম হলো। বর্ডার ক্রস করে কারোরই অন্যের জায়গাতে অনুপ্রবেশ ঘটে নি।
আমরা এমনেই থাকলাম সাত আটদিন। এরপরই চলে গেলাম নিজেদের ফ্ল্যাটে। এরপর থেকেই আমাদের শান্তির জীবন শুরু।
আমাদের ফ্ল্যাটে দুইটা মাস্টার বেডরুম, দুইটাতেই অ্যাটাচড বাথ। আমি উত্তরের রুমটা নিলাম, অর্থি দক্ষিণের রুমটা নিলো। অফিসে বা বাইরে গেলে দুজনেই রুমে তালা দিয়ে যাই। মেইন দরজার দুইটা চাবিও আছে দুজনের কাছে। কে কখন বাইরে যাই, কে কখন বাসায় থাকি, কোন খোঁজ থাকে না, খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজনও পড়েনা। বাসায় থাকলে আমরা নিজেদের রুমের দরজা লাগিয়েই রাখি। তাই সারা সপ্তাহে আমাদের তেমন একটা দেখাও হয় না। নিজেদের রান্না আমরা নিজেরাই করি।
শুধু শুক্রবারটায় আমাদের বাড়িতে বুয়া আসেন। সেদিন আমাদের একটু স্বামী-স্ত্রীর অভিনয় করতে হয়। বুয়া সেদিন ঘর ঝাড়ু দেন, কাপড় ধুয়ে দেন। আমি আর অর্থি সোফায় বসে বসে পপকর্ন খাই আর টিভি দেখি। সেদিন দুপুরে আমরা খাইও একসাথে। আমি একপদ রান্না করি, অর্থি আরেকপদ রান্না করে। খেতে বসে একজন আরেকজনের রান্নার তারিফ করি। আমাদের মধ্যে শুধু অতটুকুই কথা হয়।
আপনারা ভাবছেন, এভাবেই আস্তে আস্তে আমাদের মধ্যে ভাব হয়ে যাবে। সিনেমা আর নাটকে তো এমন অনেক কাহিনীই দেখা যায়। কিন্তু আমি দৃঢ় বিশ্বাসে বলতে পারি, এমনটি কখনোই হবে না। অর্থি অর্থির মতো থাকবে, আমি আমার মতো থাকবো। আমাদের মধ্যে চুক্তির কোনো শর্তই লঙ্ঘিত হবে না।
মাঝেমধ্যে আমার মা বা অর্থির বাবা-মা বেড়াতে আসেন। অর্থি ওর রুমটা উনাদের জন্য ছেড়ে দিয়ে আমার রুমে থাকে। রাতে আমরা খাটের মাঝে বর্ডার পদ্ধতি অবলম্বন করে ঘুমাই। বর্ডার ক্রস করে কারো অন্যজনের জায়গায় অনুপ্রবেশ ঘটে না, কখনো ঘটবেও না।
এক শুক্রবার দুপুরে বসে খাচ্ছি, এমন সময় অর্থি জিজ্ঞেস করলো, 'আপনি বিয়ে করতে চাচ্ছিলেন না কেন? ছ্যাঁকা খেয়েছিলেন?'
ভাবলাম, কি সমস্যা আর বললে, ও তো এখন আমার ফ্ল্যাটমেটই। বললাম, 'হ্যাঁ। শুধু ছ্যাঁকা না, খারাপ রকমের ছ্যাঁকা। তিনবার প্রেম করেছিলাম, তিনবারই ছ্যাঁকা খেয়েছি। লাস্টের জন বলেছে আমি নাকি ইমম্যাচিউর, কোনো দায়িত্ব নিতে পারি না।'
অর্থি যে হো হো করে হাসা শুরু করলো, ওর হাসি আর থামেই না। আমার মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল। খাওয়া ছেড়ে উঠে রুমে গিয়ে শুয়ে পড়লাম।
বিকেলে শুয়ে শুয়ে গান শুনছি, অর্থি রুমের দরজায় টোকা দিলো। দরজা খুলতেই ও বললো, 'আসলে দুপুরের ঘটনার জন্য আমি স্যরি, ওভাবে আমার হাসা একদমই ঠিক হয় নি। ক্ষমাপ্রার্থনার অংশ হিসেবে আপনার জন্য একটু কেক বানিয়েছি। আপনি একটু চেখে দেখবেন?'
আমি চেখে দেখতে গিয়ে পুরো কেকটাই খেয়ে ফেললাম। এমন মজার কেক অনেকদিন খাইনি। অর্থিকে সেটা বলতেই ও লজ্জায় একদম লাল হয়ে গেলো।
আমাদের মধ্যে কিন্তু কিছু হলো না, হবার কথাও না। কারো প্রশংসা করলে সে একটু লজ্জা পাবেই। এটা নিয়ে অতিরিক্ত রোমান্টিসিজমের কিছু নেই।
পরদিন থেকে আমরা আমাদের মতোই থাকি। অফিস করি, বাসায় এসে খাই আর ঘুমাই। কেউ কারো খোঁজও রাখি না।
এক রবিবার ফ্রিজ থেকে খাবার বের করতে গিয়ে দেখি অর্থির খাবার বক্স খালি। নিশ্চয়ই অফিসে যাওয়ার আগে কিছু রান্না করে রেখে যেতে পারে নাই। অফিসে মনে হয় অনেক কাজের চাপ, কাল অনেক রাত পর্যন্ত দেখেছিলাম ওর দরজার নিচের ফাঁক দিয়ে লাইটের আলো আসছে। আমি যে ওকে স্টক করে বেড়াই, এমনটা না কিন্তু।‌ কাল‌রাত জেগে পিএসজি আর রিয়ালের খেলা দেখেছিলাম, তখনই এমনটা দেখেছি। মেয়েটার জন্য মায়া হলো, হাজার হোক, ফ্ল্যাটমেট তো। নিজেই কিছু রান্না করে ওর খাবার বক্সে রেখে দিলাম।
পরদিন অর্থি বললো, 'আপনি আমার জন্য রান্না করেছিলেন, সো সুইট অফ ইউ। আমি কিন্তু বাইরে থেকে খেয়ে এসেছিলাম।'
'ওহ, আচ্ছা।'
'তবুও বাসায় এসে আপনার রান্না খেয়েছি। এতো মজার আপনার রান্না।'
আমি লজ্জায় লাল হয়ে গেলাম। কিন্তু এটা তেমন কিছু না। কারো কাছে একটু প্রশংসা পেলে অমন লজ্জায় একটু লাল হওয়াই যায়।
আরেকদিন অর্থি আমার জন্যও রান্না করে রেখে দিলো। আমি খেলাম। এরপর মাঝেমধ্যেই আমরা একজন আরেকজনের জন্য রান্না করি। এটাও তেমন কিছু না।
আরেক শুক্রবার অর্থির বান্ধবির বিয়ে। চুক্তির শর্ত মোতাবেক আমাদের স্বামী-স্ত্রীর অভিনয় করতে হবে। অর্থি শাড়ি পড়লো, আমি পাঞ্জাবি। অর্থিকে অপূর্ব লাগছিলো শাড়িতে। সেটা ওকে বললাম। ও লাজুক হেসে পাঞ্জাবিতে যে আমাকে ভালো লাগছে সেটাও বললো। এমনটা সে বলতেই পারে, কাউকে দেখতে ভালো লাগছে বলা তো অপরাধের কিছু না। আমরা বিয়েতে গেলাম। খুব সুন্দর স্বামী-স্ত্রীর অভিনয় করলাম। সবাই তো আমাদের জুটির সেই প্রশংসা করলো।‌ আসার পথে সেইসব কথা নিয়ে আমরা খুব হাসাহাসিও করলাম।
আরেক শুক্রবার বেড়াতে গেলাম আমরা। অনেক অনেক ছবি তুললাম, ফুচকা চটপটি খেলাম। এগুলো কিন্তু সব চুক্তির শর্ত মানার জন্যই, স্বামী-স্ত্রীর অভিনয়ের জন্য। বাসায় ফিরে যে যার রুমে বসে ছবি আপলোড দিলাম। অর্থি ওর ছবিতে ক্যাপশন দিলো- 'উইথ মাই ডিয়ার হাবি'। পাশের রুমে বসে আমি ওর ছবির ক্যাপশন দেখে হাসতে লাগলাম। তারপর নিজেও আমার আপলোড করা ছবিগুলোতে ক্যাপশন লাগালাম- 'উইথ ডিয়ার বউ'। আমি নিশ্চিত, অর্থিও পাশের রুমে বসে হাসছে।
এখন আমাদের মাঝে টুকটাক কথা হয়। সেটা হবেই। একই ফ্ল্যাটে আছি আমরা এতোদিন, এমন একটু আধটু কথা হওয়াই স্বাভাবিক।
আমাদের টিভি দেখার সময়ও ভিন্ন। অর্থি টিভি দেখে সন্ধ্যা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত। আমি দশটার পর থেকে মাঝরাত। এখন অবশ্য একটু আধটু চেঞ্জ হয় রুটিনে। আমি মাঝে মাঝে নটার আগেই চলে যাই টিভি দেখতে, অর্থির সাথে বসে টিভি দেখি। অর্থিও মাঝেমাঝে দশটার অনেক পর পর্যন্ত টিভি দেখে আমার সাথে বসে। কি করবো বলেন, সবসময় তো আর রুটিন ধরে চলা যায় না। একটু আধটু পরিবর্তন তো লাগেই।
এখন আমরা শুক্রবারগুলোতে প্রায়ই বাইরে যাই, ঘোরাফেরা করি। এই কষ্টটুকু কিন্তু সেই চুক্তির শর্ত মানার জন্যই- স্বামী-স্ত্রীর অভিনয়ের। আমরা ঘুরি-ফিরি, মুভি দেখি, রেস্টুরেন্টে খাই, মাঝেমাঝে আত্মীয়-স্বজনের বাসায় যাই। আমাদের স্বামী-স্ত্রীর অভিনয় খুব নিঁখুতভাবে চলে, বাইরের কেউ ধরতেই পারে না।
আজ আমাদের বিয়ের এক বছর পূর্তি। অফিস থেকে ফেরার পথে দেখলাম এক মেয়ে ফুল বিক্রি করছে। চিন্তা করলাম, অর্থির জন্য কিছু নিয়ে যাই। হাজার হোক, ফ্ল্যাটমেট তো। ওকে এমন একটু আধটু উপহার মাঝেসাঝে দেয়াই যায়।
অর্থি ফুলগুলো দেখে খুব খুশি হয়। বারবার ঘ্রাণ নিতে থাকে। ফুলদানিতে খুব যত্ন করছ সাজিয়ে রাখে।
এমনটা করাই স্বাভাবিক।‌ ফুলগুলোও তো খুব সুন্দর।
রাতে খাওয়ার পর আমি বসে টিভি দেখতে থাকি। অর্থিও আসে , রোজকার দিনের মতোই। আজকে অবশ্য একটু অন্যরকম লাগছে ওকে দেখতে, শাড়ি পড়েছে, খুব সুন্দর করে সেজেছে। অসাধারণ লাগছে ওকে দেখতে। তবে ও সাজতেই পারে ইচ্ছে হলে। আমারও যেমন পাঞ্জাবি পড়তে ইচ্ছে হয়েছে, আমি পড়েছি। কারও ব্যক্তিগত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা হয়নি। চুক্তির শর্তও বিঘ্নিত হয়নি।
আমরা পাশাপাশি বসে টিভি দেখতে থাকি। টিভিতে খুব সুন্দর একটা মুভি হচ্ছিলো, 'ইটারনাল সানশাইন অফ স্পটলেস মাইন্ড'। আমরা আগে অনেকবার দেখেছি, আবার দেখতে থাকি। অর্থি আমার ঘাড়ে মাথা রাখে। রাখতেই পারে। সারাদিন যে খাটাখাটনির মধ্যে থাকে মেয়েটা, ক্লান্ত হওয়াই স্বাভাবিক।আমিও ঘাড়টা পেতে দেই ওর জন্য, এরপর ওর মাথার দিকে নিজের মাথা এলিয়ে দেই। শুধু ওকে একটু কমফোর্ট দেওয়ার জন্যই। আর কিচ্ছু না।
আমাদের মধ্যে কিছু হয়নি, কিছু হবেও‌ না।
(শেষ)
গল্প- কিছু হওয়ার কথা ছিল না
লেখা- সোয়েব বাশার
তারিখ- ২৫/০২/২০২২

Enjoyed this article? Stay informed by joining our newsletter!

Comments

You must be logged in to post a comment.