Top: নীলাভ্র আর নীলাম্বরীর গল্প

ডাস্টবিনে ময়লা ফেলতে যেয়ে একটা প্রেগন্যান্সি টেস্ট কিট দেখতে পেল শিহাব। ময়লার ঝুড়ি থেকে সেটা তুলে দেখল সেখানে রেজাল্ট পজিটিভ দেখাচ্ছে। আনন্দে ইয়াহু বলে চিৎকার দিলো সে। তার মানে আরিফা মা হতে চলেছে আর সে বাবা।
নিজের আনন্দটাকে দমিয়ে নিয়ে ভাবল আরিফা এখনো তাকে বিষয়টা জানায়নি কেন? নিজেই নিজের প্রশ্নের উত্তর দিল সে। হয়ত সে আয়োজন নিয়ে তাকে বলতে চাচ্ছে। সেজন্যই কিছু জানায়নি।
সে অপেক্ষা করবে খবরটা আরিফার মুখ থেকে শুনার জন্য। কিন্তু সে আশ্চর্য হয়ে খেয়াল করল প্রায় এক মাস হতে চলল আরিফা তাকে এই বিষয়ে কিছুই জানায়নি। ধৈর্যের বাধ প্রায় ভেঙে গেল তার।
আরিফাকে সে সরাসরি জিজ্ঞেস করে বসল,
-আরিফা, তুমি কী আমাকে কিছু জানাতে চাও?
আরিফা ভ্রু কুঁচকে উত্তর দিল,
-কই? নাতো।
এবার দাঁত চিবিয়ে সে উত্তর দিল,
-তুমি মা হতে চলেছ, আর এটা আমাকে জানানোর প্রয়োজন মনে করলে না?
আরিফা স্বাভাবিক ভাবেই জিজ্ঞেস করল,
-তুমি কীভাবে জানলে?
-আমি প্রেগন্যান্সি টেস্ট কিটটা দেখেছি।
-ওহ।
-শুধু ওহ! আমি বাবা হতে চলেছি এটা জানার অধিকার কি আমার নেই?
-আমি এবোর্শন করে ফেলেছি। আমি এখনই মা হওয়ার জন্য রেডি না, শিহাব।
শিহাব যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না। এত সহজ ভাবে এমন ভয়ানক কথা সে বলছে কীভাবে! হতবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
-বাবার পারমিশন ছাড়া কোনো ডাক্তার...
তাকে থামিয়ে দিয়ে আরিফা বলল,
-টাকায় কথা বলে, শিহাব। আমি একটু বের হচ্ছি। এই বিষয় নিয়ে আর কথা বলতে চাই না। বাই।
এই বলে আরিফা বেরিয়ে গেল। শিহাব ধপ করে খাটের উপর বসে পড়ল।
মায়ের ফোন টা রেখে আরিফা রেগে বলল,
-তুমি মাকে সবটা জানিয়েছো?
-হ্যাঁ, এছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। প্লিজ আগের বারের বাচ্চাটা তুমি এবোর্শন করিয়েছো। এবারের বেবিটা রাখো। তার সমস্ত দায়িত্ব আমি নেবো।
তখনই আরিফার নাম্বারে একটা টেক্সট আসলো। তার মা টেক্সট দিয়েছে।
'পুরো কথাটা না শুনে ফোন রেখে দিলি। এবারের বেবিটার কোনো ক্ষতি যদি তুই করিস, তাহলে আমরা ভুলে যাব আমাদের কোনো মেয়ে আছে। আমাদের সব সম্পত্তি থেকেও তুই বঞ্চিত হবি।'
রাগে আরিফা ফুসছে। এখন তার ক্যারিয়ারের শুরু। এখনই বাচ্চা নিয়ে সে তার ক্যারিয়ারটা শেষ করতে চায় না। অথচ তারা সবাই মিলে বাচ্চা বাচ্চা করে তাকে পাগল করে দিচ্ছে।
সে রাগটা শান্ত করে শিহাবকে বলল,
-আচ্ছা, আমরা তো সারোগেসির মাধ্যমেও বাচ্চা নিতে পারি। অনেকেই তো এভাবে বাচ্চা নিচ্ছে।
-কিন্তু সেটা তো যাদের সমস্যা, তারা নিচ্ছে। আমাদের তো কোনো সমস্যা নেই।
-কিন্তু....
শিহাব এবার আরিফাকে ভয় দেখানোর জন্য বলল,
-তুমি যদি এই বাচ্চাটা না রাখো তাহলে আমিও তোমার সাথে থাকব না।
আরিফা রাগে বসে পড়ল। শিহাব সেখান থেকে চলে গেল। তার মনে পড়ছে সে তো পিল খেয়েছিল। শিহাবই তো খাইয়ে দিয়েছে। তাহলে কী শিহাবই পিল টা পাল্টে দিয়েছে? শিহাবের উপরেও প্রচন্ড রাগ হচ্ছে তার।
কিন্তু এখন আর কিছু করার নেই। শিহাব এখন বাইরে যাওয়া কমিয়ে দিয়েছে। তার অফিসের কাজ সে বাসায় বসেই সারে। সারাক্ষণ আরিফার সাথেই থাকে।
আরিফা তৈরি হয়ে কোথাও যাচ্ছিল। শিহাব বলল,
-তুমি কি বের হচ্ছো?
-হ্যাঁ।
-আচ্ছা, এক মিনিট। আমি শার্ট টা পাল্টে আসছি।
-মানে! তুমি কি এখন আমার পিছু পিছু থাকবে নাকি?
-হ্যাঁ, তাই থাকব। আর নয়ত কখন এই বাচ্চাটিকেও তুমি এবোর্শন...নাহ। আমি সেটা ভাবতেও চাই না।
সাধারণত এই কেয়ার গুলো একটা মেয়ের পেতে ভালো লাগলেও আরিফার মোটেও ভালো লাগছে না। তার মনে হচ্ছে সে শিহাবের কাছে বন্দি হয়ে আছে।
বের হতে হতে শিহাব বলল,
-অন্তত এই বাচ্চাটি জন্ম নেয়া পর্যন্ত তুমি অপেক্ষা করো। এরপর আর তোমাকে জ্বালাতন করব না।
আরিফা দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
-তুমি কী জানো তুমি যে আমকে ঠকিয়েছো?
শিহাব বুঝতে পারল সে কোন বিষয় নিয়ে বলছে। সে লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলে বলল,
-সেজন্য আমাকে মাফ করে দিও, আরিফা। আমার বাবা ডাক শুনার খুব ইচ্ছে, জানো?
আরিফা থপথপ করে চলে যাচ্ছিল। শিহাব গিয়ে হাত ধরে বলল,
-আস্তে নামো। আমি তোমাকে ধরে ধরে নামছি।
পরিচালকের সাথে দেখা করতে এসেছে আরিফা। মিঃ রাসিফ বিরক্ত হয়ে বললেন,
-তোমার এই উজ্জ্বল ক্যারিয়ারের সময় তুমি বাচ্চা নিয়ে নিলে? এরপর তো বাচ্চা সামলাতে সামলাতে তোমার দিন যাবে।
মাঝখানে শিহাব উত্তর দিলো,
-অনেকেই তো বাচ্চা, সংসার নিয়েও অভিনয় জগতে আছেন।
আরিফা ওর কানের সামনে ফিসফিস করে বলল,
-তুমি চুপ করো। আমাকে বলতে দাও।
আরিফা হাসি হাসি মুখ করে বলল,
-আমাকে কয়েকটা দিন সময় দিন। এই বাচ্চাটা জন্মানোর পর...
-আচ্ছা, ঠিক আছে। তবে এই প্রজেক্টে তোমাকে নিতে পারছি না। নেক্সট প্রজেক্টে তোমাকে নিচ্ছি।
আরিফা আর শিহাব বেরিয়ে এসেছে। আরিফার মুখ ঢাকা। শিহাব বুঝতে পারছে আরিফা রেগে আছে। সে চুপ করে রইল।
রাগ বেশি হলে অনেকক্ষণ শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা ওর একটা স্বভাব। বাড়িতে এসেই সে বাথরুমে ঢুকতে গেল। শিহাবও সাথে ছিল। সে বিদ্রুপ করে বলল,
-এখন কি বাথরুমেও আমার সাথে আসবে?
-না, না। যাও। তবে সাবধানে। সাবান যেন নিচে না পড়ে।
আরিফার রাগে নিজের চুল ছিড়তে ইচ্ছে করছে।
অনেকক্ষণ বাদে একটা চিৎকারে শিহাব দৌড়ে আসলো। বাথরুমের সামনে গিয়ে সে বলল,
-আরিফা, কী হয়েছে তোমার? দরজা খোলো।
আরিফা কোনো মতে উঠে দরজা খুলল। এরপর যা দেখল তাতে হতভম্ব হয়ে গেল শিহাব। পুরো বাথরুম রক্তে ভেসে যাচ্ছে।
আরিফাকে ভিজা কাপড়েই কোলে নিয়ে হাসপাতালে ছুটলো সে।
এক্ষুণি অপারেশন করাতে হবে। শিহাবের খুব চিন্তা হচ্ছে। আরিফা ঠিক থাকবে তো?
কিছুক্ষণ পর অপারেশন থিয়েটারের লাইট নিভে গেল।
আরিফাকে বেডে শিফট করা হয়েছে। তার মুখে বিষন্নতার ছাপ। শিহাব ওর সাথে দেখা করতে এসেছে। শিহাব জোর করে মুখে হাসির রেখা টেনে রেখেছে। ওর সামনে বসে মাথায় হাত রেখে বলল,
-এখন কেমন আছো?
আরিফা রুগ্ন স্বরে বলল,
-এইতো ভালো।
-আর কংগ্রাচুলেশন।
আরিফা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
-কেন?
-আমাদের এই বাচ্চাটাও দুনিয়ার মুখ দেখল না, সেজন্য। তুমি তোমার স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে।
আরিফা চুপ করে রইল। তার চোখ থেকে এক ফোটা পানি নিচে গড়িয়ে পড়ল।
(সমাপ্তি)
মিসক্যারেজ
অরণী মেঘ

Enjoyed this article? Stay informed by joining our newsletter!

Comments

You must be logged in to post a comment.