তামান্না আপুর মেহেন্দির দিন ইফতি আমার লেহেঙ্গায় মেহেদি লাগিয়ে দিয়েছিলো। গ্রিন আর ইয়েলো শেডের এই লেহেঙ্গাটা আমার সবচেয়ে পছন্দের ছিল। সেদিন আমি খুব কান্নাকাটি করেছিলাম। সবে ক্লাস টেনে উঠেছি। কিশোরী বয়স। অল্পতে কান্না করার স্বভাব। ইফতি অবশ্য খুব বকাও খেয়েছিলো তামান্নাপুর কাছে এই দুষ্টুমির জন্য। তামান্না আপু হলো আমার বান্ধবী নূরের বড় বোন। আর ইফতি হচ্ছে ওদের কাজিন। ঢাকা থেকে এসেছে বিয়ে এটেন্ড করতে। ভার্সিটি পড়ুয়া এতো বড়ো একটা ছেলে আমার পেছনে লেগে আছে সেই থেকে। সুযোগ পেলেই আমার বিনুনি ধরে টেনে দেয়। লম্বা চুল হওয়ার এই এক জ্বালা।
ড্রেস চেঞ্জ করে আমি যখন স্টেজের দিকে যাচ্ছিলাম ঠিক তখনই পেছন থেকে সে আমার বিনুনি টেনে ধরলো। আমাকে আড়ালে নিয়ে বলল, খুব বকা শুনিয়েছো তখন আমাকে। এখন তার শোধ তুলবো।
আমি খুব ভয় পেয়ে গেলাম। কী করবে ছেলেটা! ইফতি যখন আমার দিকে হাত বাড়াচ্ছিলো তখন আমি ভয়ে চোখ বন্ধ করে ছিলাম। ওর হাত আমার বিনুনিতে। একটু একটু করে ও আমার পুরো বিনুনি খুলে ফেলল। কানের কাছে মুখটা এনে বলল, এটাই তোমার শাস্তি। পুরো সন্ধ্যে তুমি খোলা চুলে থাকবে। যদি চুল বেঁধেছো তাহলে পরের শাস্তিটা আরও কঠিন হবে।
আমি এক দৌড়ে সেখান থেকে পালিয়ে গেলাম। পুরো সন্ধ্যে আমি খোলা চুলে ঘুরে বেড়ালাম। আমাকে দেখে ইফতি অদ্ভুত এক শান্তিতে মেতে ছিল। খুব বদমাশ ছেলেটা। এই লম্বা চুল ছেড়ে খুব মুশকিলে পড়ে গেলাম৷ বাতাসে সব চুল মুখের উপর চলে আসে।
হলুদের দিন আমি রুমের দরজা আটকে বসেছিলাম। জানতাম বদ ছেলেটা আমাকে হাতের কাছে পেলেই হলুদ মাখাবে। সবাই অনেক ডাকাডাকি করেও আমাকে রুম থেকে বের করতে পারলো না। পেট ব্যাথা করছে বলে কাটিয়ে দিয়েছি। এত্ত খিদে পেয়েছিলো যে শেষমেষ আমাকে বাইরে বেরোতেই হলো। চুপিচুপি রান্নাঘরে যাচ্ছিলাম এমন সময় পেছন থেকে একজন আমার বিনুনি টেনে ধরলো। লম্বা চুল বাঁধতে ঝামেলা লাগে বলে সবসময় এক বেনি করে রাখি। চুলে টান লাগতেই বুঝে গেলাম সেই বদ ছেলেটা। সে ফিসফিস করে বলল, তুমি আমায় ভয় পাও কেন? আমি কি বাঘ না ভাল্লুক?
আপনি একটা বদ ছেলে। একথা বলেই আমি দৌড়ে পালানোর ব্যর্থ চেষ্টা করলাম। ইফতি আমার হাত চেপে ধরে আমার গালে হলুদ লাগিয়ে দিলো৷ সেই প্রথম কোনো পুরুষের স্পর্শ পাওয়া। আমার নিঃশ্বাস আটকে আসছিলো বারবার। সে কানে কানে বলল, আবার চুল বেঁধেছো তাই আবার শাস্তি দিলাম। এরপরের শাস্তি আরও ভয়াবহ হবে। আর এই হাত যেন আমি ছাড়া অন্য কেউ না ধরে। তাহলে কিন্তু ডাবল শাস্তি হবে।
আমি ওকে ধাক্কা দিয়ে দৌড়ে পালালাম। সারাদিনে আর ইফতির মুখোমুখির হইনি আমি৷ ইশশ কী লজ্জাজনক ব্যাপার!
বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে রুমে এসে একটা প্যাকেট দেখতে পেলাম। প্যাকেটটা খুলতেই দেখি গ্রিন আর ইয়েলো শেডের একটা লেহেঙ্গা। সাথে একটা চিঠি।
"পছন্দের ড্রেস নষ্ট করার জন্য সরি। তুমি কিন্তু খবরদার একদম চুল বাঁধবে না। বাঁধলেই কিন্তু শাস্তি পেতে হবে। তোমাকে খোলা চুলে খুব মানায়। আমি আজ ঢাকায় চলে যাচ্ছি। এটা আমার ফোন নাম্বার। কখনো ইচ্ছে হলে ফোন করো। আমি তোমার ফোনের অপেক্ষায় থাকবো।"
আমার কাছে তখন ফোন ছিলনা। আমি মাঝেমধ্যে ছোট ফুপির মোবাইল থেকে ইফতিকে ফোন করতাম। ও হ্যালো বলতেই কেটে দিতাম। ওর কন্ঠস্বর শুনলেই আমার হার্টবিট বেড়ে যেতো। কথা বলার সাহস হয়ে উঠতো না। ইফতি অবশ্য বুঝতো আমিই ওকে ফোন করেছি। এরপর একদিন খুব সাহস করে কথা বলেই ফেললাম। আর সেদিনই বাসায় ধরা পড়ে গেলাম। এ নিয়ে বাসায় প্রচন্ড ঝামেলা হলো। বাবা, কাকাদের খুব ভয় পেতাম আমি। বাসা থেকে আমার বিয়ে ঠিক করে ফেললো। ছেলে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার। লুকিয়ে লুকিয়ে নূরের বাসায় গিয়ে ওদের ফোন থেকে ইফতিকে ফোন করে সবটা জানালাম।
ইফতি বলল, বিয়ে ঠিক হয়েছে। বিয়ে তো হয়ে যায় নি। হাতে অনেক সময় আছে।
আমার খুব রাগ হলো। আমি ওর সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিলাম। এসএসসি পরীক্ষার আগে বাবা তার মেয়ের বিয়ে দিবেন না বলে জানালেন পাত্রপক্ষকে। আমি মনে জোর পেলাম। ইফতিকে জানালাম এবার বাসায় এসে আমাদের বিয়ের কথা বলতে।
ইফতি ওর মাকে নিয়ে আমাদের বাসায় এলো। কিন্তু বাবা, চাচারা কেউই রাজি হলো না। ইফতির এখনও পড়াশোনা শেষ হয় নি। এরকম বেকার ছেলের হাতে আমার পরিবার তাদের মেয়েকে তুলে দিতে নারাজ। আমাকে বিয়ে করতে হলে আগে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে বলে জানালেন বাবা৷ ইফতিকে বাবা প্রশ্ন করেছিলেন, হাতে ইঞ্জিনিয়ার পাত্র থাকতেও তোমার সাথে কেন মেয়ের বিয়ে দিবো?
ইফতি সেদিন কিছু বলতে পারেনি৷ আমাকে ভালোবাসা ছাড়া আর কিছুই দিতে পারবে না বলে সেদিন মাথা নিচু করে চলে যেতে হয়েছিলো ওকে। আমিও নাছোড়বান্দা। অন্য কোথাও বিয়ে দিলে সব কিছুতে আগুন লাগিয়ে দিবো বলে একদম শক্ত হয়ে বসে রইলাম। বাবা একপর্যায় জোর করে আমার বিয়েটা দিয়েই দিচ্ছিলো সেই ইঞ্জিনিয়ার ছেলের সাথে। কিন্তু আমিও তারই মেয়ে। বিয়ে করবো না বলে খাওয়া দাওয়া একদম বন্ধ করে দিলাম। আমার যেকোনো কিছুর বিনিময়ে ইফতিকে চাই। না খেতে খেতে আমি অসুস্থ হয়ে পড়লাম। আমাকে হসপিটালাইজ করা হলো। বাসার সবাই খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলো। বাধ্য হয়ে বিয়েটা ক্যান্সেল করে দিলো বাবা। শুধু ছোট ফুপি আমাকে ভরসা দিতো। ছোট ফুপির কাছে ফোন করে সেদিন সে কী কান্না ইফতির। আমাকে শুধু একবার দেখার জন্য ছটফট করছিলো। এ এমন এক সম্পর্ক যেখানে ভালোবাসার মানুষটা অসুস্থ হলেও তাকে দেখতে আসার অধিকার নেই।
স্কলারশিপ পেয়ে ইফতি যুক্তরাষ্ট্রের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে চলে গেল। যাওয়ার আগে অবশ্য আমার সাথে দেখা করে গিয়েছিলো। ছোট ফুপিই আমাকে ইফতির সাথে দেখা করতে নিয়ে যায় লুকিয়ে। এই মানুষটা না থাকলে হয়তো আমি সত্যিই ইফতিকে হারিয়ে ফেলতাম।
ইফতি সেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের অন্য এক পরিচিতি তৈরি করে। নিজের একটা সংস্থা হয়েছে ওর। সেখানে সমস্ত অসহায় বাচ্চাদের দেখাশোনা করে ও। ধীরে ধীরে সংস্থাটা এতো সুনাম অর্জন করে যে পত্রিকায় ইফতির ছবি বের হয়।
সকালে আমি পত্রিকাটা বাবার ঘরে গিয়ে রেখে আসি। বাবা ঘুম থেকে উঠে আগে পত্রিকা পড়ে তাই। দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে রইলাম বাবার মুখের এক্সপ্রেশন দেখার জন্য। বাবা ইফতির খবরটা পড়ে কাগজটা টেবিলের উপর রেখে দেয় স্বাভাবিক ভাবেই।
বাবা আবারও আমার বিয়ে ঠিক করলেন। এখনও বাবা ইফতিকে অপছন্দ করেন। আমি ইফতিকে বললাম, তাড়াতাড়ি বাংলাদেশে এসে বাবাকে রাজি করাতে। কিন্তু ইফতিও আমার কথার কোনো পাত্তা দিলো না। এমন ভাব করছিলো যেন আমার বিয়ে হয়ে গেলো ওর কিছুই যায় আসে না। এতো রাগ হলো আমার যে, আমি বিয়েতে রাজি হয়ে গেলাম। ছেলের মা এসে আমাকে আংটি পড়িয়ে গেলেন। ছেলের ছবিটা আমার পড়ার টেবিলের ড্রয়েরের মধ্যেই পড়ে রইলো। যাকে ভালোবাসি না তার মুখ দেখে কী হবে! আর যাকে ভালোবাসি তাকে মনে রেখেও কাজের কাজ কিছু হবে না। "আউট অফ সাইড আউট অফ মাইন্ড" বলে একটা কথা আছে। কথাটা এখন আমার সত্যি মনে হতে লাগলো। ইফতি আমাকে ভুলে গেছে। ও আমায় চায় না। নয়তো বিয়ের কথা শুনেও ওর কোনো রিয়েক্টশন নেই। একবার সাহস করে বাবার কাছে এসে বলতে তো পারতো যে, ও এখনও আমায় ভালোবাসে! আমিও আর ওকে ফোন করবো না।
তখন আমি এইচএসসি পরীক্ষার্থী। আমি পড়শোনায় মন দিলাম। কিন্তু হুটহাট আমার ইফতির কথা মনে পড়তো। তখন হুহু করে কেঁদে উঠতাম। পরীক্ষা শেষ হলো। বিয়ের দিনক্ষণও এগিয়ে এলো। আমি ইফতিকে শেষ বারের মতো ফোন করলাম। কিন্তু ও আমার ফোন ধরলো না। আমিও রাগ করে বিয়ে করতে রাজি হয়ে গেলাম।
বিয়ের দিন নূর এসে বলল, এই দেখ তোর শ্বশুরবাড়ি থেকে জিনিসপত্রের সাথে এই নতুন ফোনটাও এসেছে। আন্টি আমার কাছে দিলেন তোকে দেয়ার জন্য।
মোবাইলটা অন করতেই আমার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। স্ক্রিনে ইফতির ছবি! ডায়ালে ইফতির নাম্বারটা দেখে আমি তাড়াতাড়ি সেই নাম্বারে ফোন করলাম।
ওপাশ থেকে ইফতি বলল, সারপ্রাইজ কেমন লাগলো বলো?
মানে তুমিই!!
হ্যাঁ আমিই।
আমি ড্রয়ার থেকে পাত্রের সেই ছবিটা বের করে দেখলাম, ওটা ইফতির ছবিই ছিল।
আমি রাগি স্বরে বললাম, আমাকে বলো নি কেন তুমি? আর আমাকে যে ছেলের মা এসে আংটি পরিয়ে গেল ওটা!
ওইটা আমার খালামনি। আম্মুকে তো তুমি চেনো। তাই খালামনিকে পাঠিয়েছিলাম। আর তোমার সামনে এক্সাম ছিল তাই বলিনি। বিয়ের খুশিতে যদি তোমার রেজাল্ট খারাপ হয়ে যায়। তাই সবাইকে বারন করেছিলাম তোমাকে জানাতে। আর তোমার বাবা তো এখন জামাইর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। খুব জব্দ হয়েছে এখন। শেষ পর্যন্ত উনি আমাদের বিয়ে দিতে রাজি হলেন।
আমাকে এভাবে কষ্ট দিয়ে খুব মজা পেয়েছো নিশ্চয়ই। খুব বদ তুমি। তোমার না বিনুনি অসহ্য লাগে? আজকে আমি বিনুনি করেই বউ সাজবো।
বিয়ের দিন আমাকে দেখে ইফতি বলল, বিয়ের কনে চুল বিনুনি করেছে! বলেছিলাম বিনুনি করলে শাতি পেতে হবে।
ইফতি আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।
এমন করে ধরছো কেন! আমি ব্যাথা পাচ্ছি তো।
বলেছিলাম বিনুনি করলে শাস্তি পেতে হবে। তাই শাস্তি দিচ্ছি। আজ তুমি শুধু শাস্তিই পাবে। ভালোবাসার শাস্তি।
ভালোবাসার_শাস্তি
Zannatul Eva
You must be logged in to post a comment.