Top: নীলাভ্র আর নীলাম্বরীর গল্প

শাবানা আন্টির বাবা
ছোটবেলায় আমার মাঝে মাঝে মনে হতো আচ্ছা বড় মানুষদের সমস্যাটা কি? মানে আমি ছোট; তাই অনেক কিছু জানি না ;তো প্রশ্নত করবই আর তারা বড়; তারা জানে; তো তারা উত্তর দিবেই। কিন্তু অধিকাংশ সময়ই বড়রা সেটা করে না। হয় তারা বিরক্ত হয় না হলে লামছাম টাইপের একটা কিছু বলে একটা বুজ দিয়ে দেয়। ঠিকঠাক উত্তর দিলেতো কোন সমস্যা নাই তাই না। একটা উদাহরণ দেই।
আব্বুর চাকরি তখন চিটাগাং; বাসাবাড়ি গোছানো শেষ; স্কুলে ভর্তি শেষ; একদিন দুপুরবেলা আম্মু ঘোষণা দিলেন কাল থেকে ৩:৩০মিনিটে সবার জন্য হুজুর আসবে। হল? ৩:৩০ জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা টাইম; এ সময় বাসার সবাই খাওয়া দাওয়া করে ঘুমিয়ে থাকে; বোন ভাই যে যার মতো ব্যস্ত; কাজের লোক ঘুম। নিজের ইচ্ছামত যা মন চায় তাই করা যায়। দিনের এই অতি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে লম্বা পোশাক পরা সাদা দাড়িওয়ালা লোকটা আসা শুরু করবে; আর আমার বসে এই আলিফ; বা তা সা এসব পড়তে হবে? দুদিন এ ঘটনা ঘটার পরে মাকে বললাম
: কেন আমার আরবি পড়তে হবে?
মা উত্তর দিলেন: আল্লাহ বলছে।কোরআন শরীফ পড়া লাগবে তাই।
: কেন আরবি না পরলে আল্লাহ আমার কথা শুনবে না? আব্বু যে বলে আল্লাহ সবার কথা বুঝে।
আমার মহাব্যস্ত মা কোন একটা কাজে ব্যস্ত ছিলেন; খুব বিরক্ত হয়ে বললেন
:আরবিতে বললে আল্লাহ বেশি ভালো করে বোঝে। :আমি এত কঠিন এগুলো শিখে কি করব? আল্লাহ বাংলা বুঝে না; আল্লাহর সমস্যা।তাহলে আল্লাহ একটা বাংলা টিচার রেখে বাংলা শিখে না কেন?
এইবার আমার মা :এক চড় দিব; খালি বেশি কথা! পড়াশোনা না করার উসিলা…
হলো; প্রশ্ন করলাম কি আর উত্তর দিল কি?
ব্যাস জীবনটা আমার পুরা বিভীষিকা হয়ে গেল। দুপুরে আগে আমি কত কি করতাম; এখন এক ঘন্টা কায়দা নিয়ে বসে এসব পড়তে হয়। এর থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় কি? হুজুরও আমাকে নিয়ে মহাবিপদে। অন্য ভাইবোনরা কায়দা; আমপারা ;সব শেষ করে কোরআন শরীফের দিকে চলে যাচ্ছে আর আমি তখনও আলিফ; বা; তা; প্রথম পেইজে আটকা। সপ্তাহে তিন দিন বাহানা থাকতো আমার শরীরের বিভিন্ন অংশে ব্যথা। কষ্ট করে বাকি দুইদিন পড়তে বসতাম। বসেই দেখা যেত আমার কিছু মনে নাই। আবার প্রথম থেকে শুরু।
হুজুরও আমাকে মোটিভেট করার জন্য নানা ধরনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এক পর্যায়ে তিনি শুরু করলেন ঘুষ বাণিজ্য। মানে হল পকেট এ করে আমার জন্য প্রতিদিন একটা পেয়ারা; একটা চকলেট; বরই এসব নিয়ে আসতেন।পছন্দ হলে সেদিন আমি পড়তে বসতাম আর না হলে শুরু হতো “হুজুর এখনই ব্যথা শুরু করলো পেট”।
এমন সময় আমার নানী বেড়াতে আসল।তার জীবনের দুটো শখ;বাংলা ছবি দেখা আর পান খাওয়া। ছবি অবশ্যই শাবানা আলমগীরের। যখনই সিনেমা দেখেন আমি তার আশেপাশে থাকলে দেখতাম। দেখলাম একটা ঘটনা মোটামুটি সব ছবিতেই ঘটত। সব ছবিতেই শাবানা আন্টির বাবা থাকেন; তিনি কোন একটা কারণে হঠাৎ করে বুকের বাঁ দিকে হাত দিয়ে আ আ করে মাটিতে পড়ে মরে যান। শাবানা আন্টি ও আল্লাহ গো একটা চিৎকার দেন। একদিন নানিকে জিজ্ঞেস করলাম: নানী এটা কি হয়?
নানী: হার্ট অ্যাটাক
: এটা কি অসুখ ?
:এটা হল অসময়ের অসুখ। সময় লাগে না। যেকোনো সময় আইসা পরে। আসলেই শেষ।আর উপায় নাই। :ও আচ্ছা।
ঘটনাটা মনে ধরল ।আমার মনে একটা প্রশ্ন ছিল যে হুজুরের পেট ব্যথা; কাশি; কোনোদিন কোনো অসুখ হয় না কেন? এতদিনে পাওয়া গেল। তিনটা বাজলেই জানালার দিকে তাকায় দোয়া পড়া শুরু করতাম “আল্লাহ হুজুরের যেন রাস্তার মধ্যে হার্ট অ্যাটাক হয়ে যায়; হুজুর যেন হার্ট অ্যাটাক করে উল্টে পড়ে থাকে আর কোনদিন আমাকে শিখাতে না আসে”।
বুঝলাম না আল্লাহ এই দোয়াটা কোনদিন শুনলেন না কেন।ঠিক ৩:৩০ মিনিটে দেখতাম কোলবালিশের মত হেলেদুলে হুজুর হাজির। শাবানা আন্টির বাবাকে দেখে তো মনে হয় নাই যে হার্ট অ্যাটাক জিনিসটা এত কঠিন। হুজুরের কেন হচ্ছে না বুঝলাম না ?
একদিন স্কুল থেকে ফিরে আমার পোষা খুব সুন্দর একটা সাদা খরগোশ ছিল বুয়াকে বললাম ওকে নিয়ে আসো।বুয়া আমাকে কোলে তুলে নিয়ে ভয়াবহ খবরটা দিলো। আমার খরগোশ সকালবেলা মারা গেছে। হায়রে আমার কান্না। কাঁদতে কাঁদতে মালতি বুয়াকে বললাম: কিভাবে বুয়া?হার্ট অ্যাটাক? সে মাথা নাড়লো।
আমি বললাম :খেলা করছিলো ;হঠাৎ করে ধুপ করে পরে মরে গেল?
:জি বাবু ঠিক তাই। ঘটনা একদম আমার চোখের সামনে ঘটছে।আপনি আর কাইন্দেন না।
শোকে পাথর হয়ে গেলাম। দুপুরে খেলাম না রাতেও খাবোনা ঘোষণা দিলাম। তখন আব্বুর ঘরে ডাক পরল। গেলাম। তিনি বই থেকে চোখ নামিয়ে বললেন :বস; মন বেশী খারাপ? খুব কষ্ট হচ্ছে? যে কেউ যেকোনো সময় চলে যেতে পারে তাই না?
: জানি বুয়া বলছে হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। আমি এত দোয়া করলাম আল্লাহ যেন হুজুরকে হার্ট এ্যাটাক করে মেরে ফেলে; আল্লাহ ভুল শুনল কেন? বাংলা বোঝেনা ঠিকমত?
এইবার তিনি বড় বড় চোখ করে নড়েচড়ে বসলো; বললো :কি দোয়া করো! একটু বুঝায়ে বলত?
ঘটনা বিস্তারিত বললাম।
ঘটনা শুনে তিনি কতক্ষণ হতভম্ব হয়ে থাকলেন। তারপর বললেন: এই যে তোমার খরগোশ মারা গেল তোমার প্রিয়; তোমার কত কষ্ট হচ্ছে তাই না? যদি হুজুর মারা যায়; উনার বউ বাচ্চারা কি করবে? কি খাবে? কত কষ্টের মধ্যে পড়বে? তুমি কি চাও?
আমি প্রথম বুঝতে পারলাম আমার কাজটা করা ঠিক হয় নাই। আমি বললাম: না আমি সেরকম চাই না; কিন্তু আমি তো পড়তে চাই না; তাও সে প্রত্যেকদিন এসে হাজির হয় ।হুজুর খুব বিরক্ত করে আমাকে।
:সেটা অন্য বিষয়;সেটা আমি তোমাকে আরেকদিন বুঝিয়ে বলব। এখন কথা হলো তুমি কি কাজটা ঠিক করো? কোনদিন কারো খারাপ চাইতে হয় ?আল্লাহ রাগ করবেন না ?
:ও !তাই আল্লাহ আমার সাথে রাগ করে খরগোশকে হার্ট অ্যাটাক দিয়ে দিলো?
:না মা ; খরগোশের অসুখ ছিল তাই মরে গেছে ।কিন্তু আল্লাহ চাইলেন যেন তুমি বুঝতে পারো যে তুমি যে কাজটা করছো সেটা ঠিক না। কোনদিন কারো খারাপ চাইতে হয় না।
; তো এখন আমি কি করব? আল্লাহকে সরি বলবো? :
:বলতে পারো। বললে তো আল্লাহ খুশি হবে।
: বাংলায় বলবো? বাংলা বুঝবে নাকি বুঝবেনা? :বুঝবেন। আল্লাহ সব বোঝেন।
সেদিনের পর থেকে হুজুরের জন্য হার্ট অ্যাটাক দোয়া টা শুধু বাতিল কিন্তু বাদবাকি সব কাজ প্রপারলি অন। যেমন হুজুর এসে কার্পেটে বসতেন; যে চাদর
বিছানো হতো সেখানে চিবানো তিন-চারটে চুইংগাম লাগিয়ে রাখা; হুজুর বসার সময় কখনও খেয়াল করতেন না ।তারপর যখন হুজুরের শরবত বানানো হত শরবত এর মধ্যে লবণ দিয়ে রাখা। কেঁচি দিয়ে আমার কাঁয়দার কাগজ কেটে ফেলা; জানতে চাইলে বলতাম মনে হয় ঈদুর খেয়ে ফেলসে ইত্যাদি ইত্যাদি।
নানীর কাছে আমার পরবর্তী প্রশ্ন
( নানি চশমা চোখে দিয়ে সেলাই করছেন)
: নানী; তুমি চশমা পরো কেন?
: চশমা না পড়লে আমি দেখি না সবকিছু ঘোলা লাগে।
:ও তাহলে আলমগীর আংকেল চশমা পড়ে না কেন? টাকা নাই?
: আলমগীর কেন চশমা পড়বে?
: আলমগীর আংকেল ত চোখে দেখেনা। রাস্তা দিয়ে যায় দেখনা; উল্টা পাশ থেকে কত বড় শাবানা আন্টি আসতেছে; আলমগীর আংকেল কখনোই দেখতে পায় না। ঠিক আন্টির সাথে ধাক্কা খেয়ে দুজনেই পড়ে যায়। তারপর কোথা থেকে যেন রুরু রুরু গান হয়!
এইবার আমার নানী
: মিনার এই মেয়েটা ফাজিলের ফাজিল। পড়াশুনা বাদে বাকি সবকিছু তার মাথার মধ্যে ঘুরে। পড়াশুনা করতে বললে তার মাথায় ঢুকে না। ধইরা থাপড়ানো দরকার…..
এটা কি আমার প্রশ্নের উত্তর হলো।
বড়দের সমস্যাটা কি???
জোবাইদা খানম

Enjoyed this article? Stay informed by joining our newsletter!

Comments

You must be logged in to post a comment.