বর্ষার বৃষ্টি কিনে গ্রীষ্মের উত্তাপে রং চা বানানোর স্বপ্ন নিয়ে শুরু হয়েছিল আমার জীবনের দ্বিতীয় ইনিংস। বাসর রাতে আমি দ্বিতীয়বার প্রেমে পড়েছিলাম এক অষ্টাদশীর। এ যেমন তেমন প্রেম নয়, বিয়ের পরের আশ্লিষ্ট প্রেম!
অথচ এর আগে আমার রুক্ষশুষ্ক জীবনে কখনও প্রেম আসে নি। আর আসবেই কি করে? কালো চামড়ার উপহাস শুনে শুনে চেহারাকে বার্ণিশ করার ইচ্ছেও যে, কখনো জাগে নি। তাই, আমার আর প্রেম করা হয়ে উঠে নি।
.
সদ্য চাকরী পাওয়া ছেলের বিয়ের জন্য বাবা-মা হন্যে হয়ে পাত্রী খোঁজা শুরু করলেন।। ঠিক যেন অবাধ্য ষাঁড়ের মুখে ঠুসি পরানোর দুর্নিবার চেষ্টা। এই অবাধ্য বলার পেছনে আবার একগুচ্ছ কারণ আছে। বাবা-মা যা চাইতেন, আমি করতাম ঠিক তার উল্টোটা। বাবা-মার স্বপ্ন ছেলে বড় হয়ে ডাক্তার হবে কিন্তু ছেলের পছন্দ ইঞ্জিনিয়ার। মায়ের পছন্দ তার ছেলের জন্য লাল টুকটুকে বউ আনবে, অথচ আমি বিবাহ করবো না বলে আগেই ঘোষণা করেছিলাম। তাইতো, বিয়ের জন্য এতো তাড়াহুড়ো! তবে আমার একটা শর্ত ছিল মেয়ে হতে হবে শ্যাম বর্ণের, যার মধ্যে রুপের কোন অহংকার থাকবে না। তাছাড়া সাদা চামড়ার প্রতি ক্ষোভ আমার শৈশব থেকেই। তারা কিঞ্চিৎ পরিমাণ অহংকারী হয় বটে।
.
পাত্রী দেখতে এসে প্রথম দর্শনেই প্রেম। বাবা-মা প্রশংসার দাবীদার। শ্যাম বর্ণের মিষ্টি দেখতে মেয়েটার নাম ইশরাত জাহান মৌ। ইন্টার প্রথমবর্ষ, বিজ্ঞান বিভাগ, আনন্দমোহন কলেজ। চপলতায় ভরা অষ্টাদশী কিশোরী। তার সাথে আমাকে কথা বলতে দেয়া হল। তার কথা বলার সাবলীলতায় যে কেউ মুগ্ধ হবেই। আমিও দিকভ্রান্ত হলাম, ঐ কথার জালে। শ্রাবণের বারিধারায় মুক্ত বিহঙ্গের ডানায় ভর করে প্রেম আসলো আমার এই শুকনো মরুভূমিতে। খইয়ের দানার মতো বৃষ্টির(কথার) ফোটাগুলো যখন আমার কঠিন হৃদয় ভেদ করে যাচ্ছিল, তখন অনুভব করেছিলাম ভালবাসার উষ্ণ শীতলতা।
.
মেয়ের বাবা-মার দ্বিগুণ উৎসাহ দেখে সাময়িক মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছিলাম। তারা সরকারি চাকরিজীবী পাত্রকে হাতছাড়া করতে চাইছিলেন না। আচ্ছা আপনারাই বলেন, পাত্র সরকারী চাকুরে কিংবা ধনকুবে হলেই কি মেয়ে সুখে থাকে? এইরকম গোঁড়ামি এখনও এক শ্রেণীর বাবা-মার অন্তরে গেঁথে আছে।
আমার মনে হয় কি জানেন? ''উপযুক্ত পাত্র সেইজন, যার আছে সুন্দর চরিত্র, উন্নত মানসিকতা, ধর্মীয় সন্তুষ্টি আর যে অল্পতে তুষ্ট।"
আমার বিবেচনায়, আমি উপযুক্ত পাত্র নই। ধর্মের বালাই আমার মধ্যে নেই আর টাকার প্রতি আসক্তি সীমাহীন।
সবকিছু উপেক্ষিত হয়ে সপ্তাহ না ঘুরতেই বিয়ের বন্দোবস্ত করা হল।
.
বাসর ঘরে প্রবেশ করতেই সেই অষ্টাদশী কিশোরী বিছানা থেকে নেমে আমার পদযুগল ছোঁয়ার বৃথা চেষ্টা করলো। আমি তার হাত দুটো ধরে বিছানায় বসালাম। আমাদের অনেকক্ষন চোখে চোখে কথা হয়। শব্দ হয় না। কিছুক্ষণ বাদে মৌ বিছানা থেকে উঠে যায়। শাড়ি বদলে নতুন একটা সেলোয়ার কামিজ পরে বিছানায় এসে বসে। আমি বলি,
-জামাটা বেশ মানিয়েছে।
মৌ লজ্জা পায়। বড্ড লাজুক মেয়েটা। সারাদিনে ভীষণ ধকল গেছে। আমি মেয়েটাকে বলি, শুয়ে পড়বে?
মৌ মাথা নাড়ে। বলে, ঘুমাবো।
এই বলে শুয়ে পড়ে সে। আমিও তার পাশে শুয়ে পড়ি। আমার ভাবতেই অবাক লাগে, আজ আমার বিয়ে হয়েছে। এখন আমি চাইলেও হুট করে কোথাও চলে যেতে পারবো না। যেতে হলেও কারো পারমিশন লাগবে। আজ থেকে আমাকে বাড়তি একজনের খেয়ালও রাখতে হবে। তিনি এখন আমার সমস্ত কিছুর অংশীদার। বলা বাহুল্য তিনি আজ আমার বিছানার অর্ধেক নিজের করে নিয়েছেন।
রাত তখন বেশ গভীর। দিনের বেলায় গরম পড়লেও রাতে বেশ ভালোই ঠান্ডা পড়ে। শীতে গুটিসুটি মেরে শোয়া মেয়েটার গায়ের উপর কম্বল মেলে দেই। নিজেও ঢুকে পড়ি কম্বলের ভেতর। মৌ আর আমার মাঝে খানিকটা দূরত্ব। সে চুপচাপ অপর পাশ ফিরে শুয়ে থাকল। সে কি ওপাশ ফিরে এই কথা ভাবছে যে আমি তাকে ডেকে বুকের কাছে নিবো? সে কি এই আশায় শুয়ে আছে? এক সময় নিজেই এপাশ ফিরে। অন্ধকারে আমার দিকে তাকায়। আমি দেখি নি। কিন্তু অনুভব করি। মৌ আরেকটু সরে আসে আমার দিকে। তারপর আরেকটু আসে। আবেগ মাখা কণ্ঠে বলে,
-আমাকে একটু জড়িয়ে ধরবেন?
আমি কিছু বলি না। জড়িয়ে ধরি ওকে। মেয়েটা নিশ্চিন্তে আমার বুকে মাথা রাখে। আর বললো, 'বিয়ের আগে মেয়েদের বাবা বটবৃক্ষের ছায়ায় আগলে রাখেন। কিন্তু বিয়ের পর সে সব কিছু ফেলে স্বামীর কাছে চলে আসে। একজন অজানা মানুষকে নিজের করে নেয়। আপনি যতই অজানা হোন, আমি আপনাকে নিজের করে নিবো। আপনি আমাকে সেই সুযোগটা দিবেন?'
আমি কিছু বলি না, কপালে ঠোটের স্পর্শ দিয়ে ওকে আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরি।
.
শীতের ভোর। আরামের ঘুম থেকে উঠতে ইচ্ছে হয় না। মৌ মাথার কাছে বসে কানের কাছে এসে মাথা ঝুঁকিয়ে ফিস ফিস করে আমায় ডাকে। তার চুল গুলো এক পাশে ফেরানো থাকে। সে পাশের চুল গুলো আমার মুখের উপর পড়ে। আমার তবুও ঘুম ভাঙ্গে না। আমি চোখ বুঁজে থাকি। সে নিজের নরম ঠোঁট দুটো আমার কানের কাছে লাগিয়ে বেশ কোমল স্বরে ডাকে আমায়।
-ও মশাই! উঠেন। ব্রাশে পেস্ট লাগায় রাখছি। উঠেন তো।
এমন ডাক ফিরিয়ে দেয়া আমার জন্য সত্যিই দুঃস্বাধ্যের ছিল। মৌ এর জোরাজুরিতে শুধু ফজরের নামাজটা পড়া হত। বাঁকীসময় বাহিরে কিংবা নানা অজুহাতে পার পেয়ে যেতাম।
.
একদিন বিকেলবেলায় মৌ এর সাথে আমার একটু মন কষাকষি হয়েছিল। আর হবেই না কেন? তার কখন কোনটা প্রয়োজন আমায় বলার প্রয়োজনবোধ করবে না।
মৌ কে বলেছিলাম, রেডি হয়ে থেকো। আজ একটু ঘুরতে যাবো। বাসায় এসে দেখি, পুরোনো একটা কামিজ পরেছে, তাও রংটা প্রায় জ্বলে গেছে, আর পায়ে হাওয়াই চপ্পল। রাগত স্বরে তখন জিজ্ঞেস করেছি, চামড়ার জুতো যে ছিড়ে গিয়েছে সেটা আমাকে বলোনি কেন? আমি কি এত দরিদ্র হয়ে গিয়েছি যে তোমার জন্য নতুন কাপড় কিনে আনতে পারবো না?
বরাবরের মত তার সহজ উত্তর, ''তোমার কাছ থেকে যদি চেয়ে চেয়ে নিতে হয় তবে আমার প্রতি তোমার দৃষ্টি কমে যাবে। ভালো করে আমার দিকে তাকাবে না। আমার কি আছে, কি নেই সেটা খুঁজে বের করবে না। তাই কখনই চেয়ে কিছু নিবো না। কোনো কিছু চেয়ে নেয়ার থেকে তোমার মনোযোগ কেড়ে নেয়া আমার কাছে বেশ আনন্দদায়ক। আলতা-লিপস্টিকে, জুতা-শাড়িতে আমার তৃপ্তি নাই, তৃপ্তি খুঁজে পাই তোমার নৈকট্যে। রাতের বেলায় তুমি যে শক্ত করে জড়িয়ে রাখো সে টুকু হলেই আমার চলে। আর কিছুর প্রয়োজন নেই।''
সৃষ্টিকর্তার বোধহয় মৌ'কে ব্যতিক্রম করে সৃজন করেছেন। যার জীবনে চাওয়া বলতে স্বামীর ভালোবাসা ছাড়া আর কিছুই নেই।
.
রাতে মৌ গায়ে হাত দিতেই ছ্যাঁত করে বলে উঠলো, 'আন্নে এহন মোর গায়ে টাচ করবেন না। এত্ত ভালবাসন দেহানের দরকার নাই।' আপন বউয়ের মুখে এমন কথা শুনে মনটা খচ খচ করতে লাগলো। একে তো মুখ ঘুরিয়ে শুয়ে, তারপর ভাষার আঞ্চলিকতার টানে, রাগে পিত্তি জ্বলে গেল। কিন্তু আপন বউয়ের সাথে রাগ করে আর ফায়দা কি? পেছন থেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কাঁধের কাছে মুখ নিয়ে বলি, 'এই তোমাকে কতবার বলি শুদ্ধ করে কথা বলবা, তাও কথা কানে যায় না?'
মৌ আমার দিকে ফিরে বুকে মুখ গুজে বলে, 'আপনাকে রাগাতে আমার ভাল লাগে।'
তারপর আমি চুপচাপ থাকি। মেয়েটা কেবল আমার দিকে চেয়ে থাকে। হুট করেই আমার ঠোঁটে চুমু খায়। লজ্জা পায়। চট করেই বুকের উপর মুখ লুকায় সে। আমি তাকে শক্ত করে বুকের সাথে ধরে রাখি।
.
এরপর রমজান আসলো। রোজা রাখার বালাই আমার মাঝে ছিল না। ছোটবেলায় রোজা রাখতাম। কিন্তু মৌ এর কথার জালে নিজেকে সঁপে দিতে বাধ্য হতাম। সেহেরির টেবিলে আমায় দেখে সবাই অবাক। একে অন্যের দিকে চাওয়া চাওয়ি করছিল, কেউ কিছু বলছিল না। বর্ষা মুচকি হাঁসি চেপে বললো, 'ভাইয়া তুই..? আগে কত ডাকতাম, উঠতি না। আর এইবার...!'
মৌ আগবাড়িয়ে বলে উঠলো, 'আমি তো এতদিন ছিলাম না। তাই যা খুশি করেছে। এখন তো পড়ে পড়ে ঘুমানো চলবে না। তোমার ভাইয়া আজ থেকে রোজা থাকবে, নামাজ পড়বে।'
বাবা খাবার টেবিলে ছিল বিধায় নিছক কাউকে কিছু বলতে পারলাম না। চুপচাপ সেহেরি শেষ করে ঘুমাতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। তখন সুমু বাবাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলছে, 'বাবা নামাজে যাওয়ার সময় আপনার ছেলেকে সাথে নিয়ে যাবেন।'
বাবা ছেলের মিলন দেখার জন্য মৌ ভীষণ উৎগ্রীব ছিল। মৌ ঘরে এসে ড্রয়ার খুলে নতুন পাঞ্জাবি পায়জামা বের করে আমায় দিয়ে বললো, 'আমার প্রথম টিউশনের টাকায় কেনা আপনার জন্য এই ছোট্ট উপহার। প্রায়শই আপনাকে দেবার অসিলা খুঁজতাম, কিন্তু যুতসই একটাও পাই নি। তবে আজকের চেয়ে ভালো সুযোগ বোধহয় আর পাবো না। এটা পরে দিন।' জানেন, আমার বরকে ঘিরে একগাঁদা স্বপ্ন ছিল, আমার বরটা হবে পৃথিবীর সেরা বর। কিন্তু আপনি.....! আজ আমায় কথা দেন, আপনি আমার সেরা বর হবেন?
আমি মৌ'কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলাম।
অতঃপর বাবার পিছু পিছু নামাজের উদ্দেশ্যে বের হলাম। না বের হয়ে উপায় নেই। আজ সবকিছুই আমার মতে বিরুদ্ধে হচ্ছে।কোনকিছুই এড়িয়ে যেতে পারছি না। বাবা আর আমি আগাপিছু হয়ে হাটছি, অথচ কেউ কথা বলছি না। দুজনই কেমন অস্বস্তিকর সময় পারছি।
আজ থেকে বেশ কয়েক বছর আগে বাবার সাথে আমার ভীষণ মনোমালিন্য হয়, এরপর থেকে একান্ত প্রয়োজন ছাড়া কথা বলি না। আজ কেন জানি বাবার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে। মনের মাঝে পুষে রাখা সকল মান অভিমান ভুলে কয়েক কদম জোরে হেটে বাবার পাশে এসে বাবার হাতের মধ্যে আঙুল পুরে দিলাম। আমার আঙুলের স্পর্শে বাবা নিজের হাত মুষ্টিবদ্ধ করলেন। হঠাৎ এক শীতল দমকা বাতাস হৃদয় ভেদ করে গেল। মনে হল, শরীর থেকে পাপের বোঝা নেমে যাচ্ছে। মনটা বেশ হালকা বোধ করলাম। স্মৃতির পাতা খুলে বিশ বছর পিছনে চলে গেলাম। এক অবুঝ শিশু বাবার হাত ধরে হেলতে দুলতে নামাজ পড়তে যাচ্ছে।
.
মসজিদে আমায় দেখে অনেকেই বেশ অবাক হলেও কেউ কিছু বললো না। এজন্যই মসজিদকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠঘর বলে। এখানে কেউ কাউকে উপহাস করে না, হিংসে করে না। সাদা-কালো, ধনী-গরিবের ভেদাভেদ থাকে না। মসজিদ থেকে ফেরার পথে আমার গল্পপ্রিয় বাবা আমার হাত ধরে বকবক করতে লাগলেন। কত সাবলীলভাবে কথা বলছেন। অথচ আমি কতগুলো বছর একই ছাদের নিচে থেকেও অসামান্য দুরত্ব তৈরি করে রেখেছিলাম। বাবা আমার সাথে কথা বলতে চাইলেও এড়িয়ে গেছি বহুবার। আজ বাপবেটার মিলনে জয় হল পরের বাড়ির লক্ষ্মী একটা মেয়ের।
.
বাসায় ফিরে দেখি মৌ সমধুর কন্ঠে কুরআনের তেলাওয়াত করছে। মৌয়ের মাত্রাতিরিক্ত ইসলাম প্রীতি মনোভাবের জন্য আগে কতবার রাগ করেছি। কিন্তু সে সবকিছু উপেক্ষা করে আমায় মন উজাড় করে ভালবেসেছে। আমার কখন কি প্রয়োজন সবকিছু আগে আগেই গুছিয়ে রেখেছে। বাবা মায়ের দেখাশোনা, ননদের প্রতি আদর যত্নে পুরো পরিবারটিকে একাই আগলে রেখেছে। মৌ আর বর্ষাকে পাশাপাশি দাঁড় করালে কেউ বিশ্বাস করবে না, এ বাড়ির বউ আর ননদ। মনে হয়, একই মায়ের পেটের দু বোন।
মৌ কোরআন পড়ছিল, আমি পাশে গিয়ে বসলাম। সে পড়া থামিয়ে আমার কাঁধে মাথা রাখলো, আমি তার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে অনুভব করলাম, আমি পৃথিবীর সেরা বউটা পেয়েছি। কিন্তু সেরা বরটা হতে পারি নি।
.
শ্যামাবতী
লিখা- বাঁধন আহমেদ
You must be logged in to post a comment.