বিশ্বাস হয়, আমাদের শরীরে আমাদের নিজস্ব যত না কোষ আছে, তার চেয়ে ১০ গুণ বেশি আছে ব্যাকটেরিয়া? বিজ্ঞানীরা বলছেন, আমাদের একেকজনের শরীরে ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা ৭.৫x১০১৩। সবচেয়ে বেশি ব্যাকটেরিয়া রয়েছে ত্বক, দাঁত ও মুখগহ্বর এবং পরিপাকতন্ত্রে। এই ব্যাকটেরিয়াগুলোর নাম হলো কমেনসাল। কমেনসাল শব্দটা আবার এসেছে ল্যাটিন শব্দ মেনসা থেকে, যার অর্থ হলো টেবিল। এই জীবাণুগুলো একই টেবিলে খাদ্যগ্রহণ করে কি না, আর সেই টেবিলের নাম হলো মানবশরীর! অনেকেই বলেন, ব্যাকটেরিয়ামাত্রই ভিলেন। এ ধারণাটি মোটেও ঠিক নয়। যেমন শরীরে বাসা বাঁধা এই কমেনসাল ব্যাকটেরিয়াগুলো আসলে উপকারী ব্যাকটেরিয়া। কেউ আমাদের মরা ত্বক-কোষ পরিষ্কার করছে, কেউ দাঁতের ফাঁকে খাদ্যকণাকে দূর করছে, কেউ পেটের মধ্যে খাবার হজমে সাহায্য করছে। বিখ্যাত বিজ্ঞানী লুই পাস্তুর বলেছিলেন, কমেনসাল ছাড়া জগতে কোনো প্রাণীই নেই। আর একালের বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ব্যাকটেরিয়াগুলো ছাড়া আমাদের ইমিউন সিস্টেম ঠিকমতো কাজই করতে পারবে না।
আমাদের শরীরে এই পরজীবীগুলো কোত্থেকে এল? জন্মের আগে আমরা যখন মাতৃগর্ভে থাকি, তখন অ্যামনিওটিক ফ্লুইড আর প্লাসেন্টা বাইরের পরিবেশ থেকে আমাদের সুরক্ষিত রাখে, কোনো জীবাণু প্রবেশ করতে দেয় না। জন্মের পরপরই পরিবেশের নানা জীবাণু ও পরজীবীদের সঙ্গে আমাদের আলাপ-পরিচয় হয়। এরা কেউ কেউ শরীরে প্রবেশ করে, কেউ ত্বকের ওপর, চুল বা ভ্রুর মধ্যে এসে গড়াগড়ি খায়। কেউ কেউ ঢুকে পড়ে নাক–মুখ দিয়ে শরীরের ভেতর। এভাবেই ওদের সঙ্গে শুরু হয় সখ্য ও বন্ধুত্ব। তারপর ধীরে ধীরে তারা মানবশরীরের সঙ্গে একটা দীর্ঘমেয়াদি, লাগসই ও নির্ভরযোগ্য সম্পর্ক পাতিয়ে ফেলে। এ সম্পর্কটি পারস্পরিক নির্ভরতার। তারা বেঁচে থাকার রসদ এই শরীর থেকেই গ্রহণ করে, বিনিময়ে এর কোনো ক্ষতি করে না; বরং উপকার করারই চেষ্টা করে। এ জন্য এদের আরেক নাম মিউচুয়াল অরগানিজম, মানে এদের সঙ্গে মানুষের একটা মিউচুয়াল আন্ডারস্ট্যান্ডিং বা বোঝাপড়া হয়ে যায়। তবে রক্ত, সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড বা সলিড অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যেমন যকৃৎ বা কিডনি ইত্যাদি কিন্তু জীবাণুমুক্ত। কোনোভাবে এসব ব্যাকটেরিয়া ওই সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ঢুকে পড়লে সমস্যা হতে পারে। এ জন্য এসব জীবাণুকে বলা হয় অপরচুনিস্টিক মাইক্রো অরগানিজম বা সুবিধাবাদী জীবাণু। এরা সুযোগের অভাবে ভালো মানুষ, কিন্তু সুযোগ পেলেই, যেমন—রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলেই মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে।
তো এই ব্যাকটেরিয়াগুলোকে আমরা যে পুষি, তার কিছু উপকারিতাও আছে। যেমন আমাদের সারা দেহের ত্বকে আছে মিলিয়ন মিলিয়ন জীবাণু, বিশেষ করে শরীরের ভাঁজগুলোয়। বাইরের ক্ষতিকর জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলে এরাই। ডেমোডেক্স ব্রেভিস ও ডেমোনেক্স ফলিকুলোরাম এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এরা মরা ত্বককোষ, ঘাম ও তৈলাক্ত পদার্থ খেয়ে বেঁচে থাকে। ওদিকে বাইরের কোনো ক্ষতিকর জীবাণু এলে রুখে দাঁড়ায়।
চোখের পানিতে আছে করাইনো ব্যাকটেরিয়া, এরা কর্নিয়াকে রক্ষা করার জন্য কাজ করে যায়। পরিপাকতন্ত্রে আছে ই কোলাই, এরা খাদ্যকণা ভেঙে ভিটামিন কে তৈরিতে সাহায্য করে। ল্যাকটোব্যাসিলাস আছে বলেই শিশু জন্মের পর এত সহজে দুধ হজম করতে পারে। আবার পরিপাকতন্ত্রের ব্যাকটেরিয়াগুলো অ্যাসিড ও টক্সিন তৈরি করে অন্য ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার বংশবৃদ্ধিকে বাধা দেয়, এভাবে আমাদের রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। এ কারণেই ক্ষমতাধর অ্যান্টিবায়োটিক বেশি ব্যবহার করে অন্ত্রের সব কমেনসালকে মেরে ফেলার পর অন্ত্রে বাইরের জীবাণু দিয়ে মারাত্মক সংক্রমণ ঘটে যেতে পারে। চিকিত্সাবিজ্ঞানে এই সমস্যার একটা বিশেষ নামও আছে—সিউডোমেমব্রেনাস কলাইটিস। ঠিক একইভাবে জীবাণুরোধী ও অ্যান্টিসেপটিক সাবান বেশি ব্যবহার করলে ত্বকের উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলো যায় মরে, ফলে ক্ষতিকর সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। আজকাল তাই বিজ্ঞানীরা শরীরের উপকারী জীবাণুগুলোকে ডিস্টার্ব না করে এদের সঙ্গে সহাবস্থানে থাকতেই বেশি আগ্রহ পোষণ করছেন।
বিখ্যাত হাইজিন হাইপোথিসিস বলছে যে, শিশুরা জন্মের পর খুব বেশি জীবাণুমুক্ত পরিবেশে বড় হয় এবং পরিবেশের জীবাণু বা পরজীবীদের সঙ্গে সখ্য তৈরি হয় না-পরবর্তী জীবনে তাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। এমনকি এই হাইপোথিসিসে এ ধরনের শিশুদের পরবর্তী সময়ে হাঁপানি, অ্যালার্জি, টাইপ ১ ডায়াবেটিস, মাল্টিপল স্ক্লেরসিস ও লিমফোব্লাসটিক লিউকেমিয়ায় বেশি আক্রান্ত হওয়ার প্রমাণ মিলেছে। ২০০৩ সালে এই থিওরির প্রবক্তা গ্রাহাম রুক তাই এই জীবাণুদের নাম দেন ‘ওল্ড ফ্রেন্ডস’ বা মানবজাতির পুরোনো বন্ধু। তিনি বলেন, মানবশরীরে ভাইরাস সংক্রমণের ইতিহাস বেশি পুরোনো নয়, মাত্র ১০ হাজার বছরের। কেননা এর আগে আদিম মানুষ পরিবেশ ও বনজঙ্গলের সঙ্গে এমন এক মিথস্ক্রিয়ায় বসবাস করত যে তাদের সংক্রমণজনিত রোগ হতো না বললেই চলে। এই থিওরি এটাও প্রমাণ করেছে যে যেসব শিশু বড় পরিবার, অধিক সংখ্যক মানুষ ও প্রাণীদের সাহচর্যে, যেমন—গ্রাম বা ফার্মের কাছাকাছি বড় হয়, তাদের অ্যালার্জি ও অটোইমিউন রোগের হার কম।
তার মানে হলো, ব্যাকটেরিয়ামাত্রই খারাপ নয়। আমাদের শরীরেই আছে মিলিয়ন মিলিয়ন ব্যাকটেরিয়া, এরা আমাদের বন্ধু ও সহচর। অ্যান্টিবায়োটিক ও অ্যান্টিসেপটিকের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার এবং অতিরিক্ত ‘হাইজিন সেন্স’ মানুষকে পরিবেশের স্বাভাবিক ইকোসিস্টেম থেকে দূরে ঠেলে সরিয়ে দিচ্ছে কি না, এটাও ভাবার বিষয়। সম্প্রতি হিউম্যান মাইক্রোবিয়ম প্রজেক্ট তাদের গবেষণার শিরোনাম দিয়েছে-ডিয়ার ব্যাকটেরিয়া, আই ওয়ান্ট ইউ ব্যাক!
লেখক: চিকিৎসক ও সহকারী অধ্যাপক, এন্ডোক্রাইনোলজি অ্যান্ড মেটাবলিজম, গ্রিন লাইফ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
You must be logged in to post a comment.